Chorer Ma – চোরের মা

ছোটগল্প  (রম্যরচনা, রূপকধর্মী)
চোরের মা  – হরবিলাস সরকার

এক যে ছিল সোনার দেশ। লোকেরা এখন বলে আজব দেশ। সে দেশের এক নারী সর্বময় কর্ত্রী। তাঁর অনুগত মানুষেরা তাঁর সুযোগ্য পুত্র-কন্যা। পুত্র-কন্যারাও তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করে।

(গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক)

বাছারা, সবাই মন দিয়ে শোন। ফরাসি লেখক ‘লিকক’ পুরানো প্রবাদগুলোকে  নতুন করে লিখতে বলেছিলেন। সেরকমই একটি প্রবাদ, তাঁর মতে – কাঁচের ঘরে বসেই ঢিল ছোড়া উচিত।

মা, ফরাসি লেখক নয়, ইংরেজ লেখক।

কী বললে,  ইংরেজ লেখক? কিন্তু কলেজে তো পড়েছিলাম – ফরাসি লেখক। ফরাসি থেকে ইংরেজ হয়ে গেল? যাইহোক, আসল কথায় আসি। তো কাঁচের ঘরে বসে বাইরে ঢিল ছোড়া উচিত কেন, বলতে পারো? যাতে বাইরে থেকে কেউ ঢিল ছুড়ে সহজে তোমাদের ঘর ভাঙতে পারে।

না মা, যাতে বাইরে থেকে কেউ ঢিল ছুঁড়ে সহজে আমাদের ঘর ভাঙতে না পারে।

আরে বাবা, ‘না’ একটা ছোট্ট কথা, বাদ রয়ে গেছে। ওটা স্লিপ অফ টাং। যাকগে, এখন আমি যেটা বলছি, শোন। কাজটা তোমরা সাবধানে করলেও বিপদ ঘাড়ে এসে পড়েছে। সরকারি অর্থ তছরুপ, সম্পত্তি বিক্রি, কাটমানি আদায়, ইত্যাদি ইত্যাদি,  এসব করে তোমাদের যেমন বেশ উন্নতি হয়েছে তেমনি আমারও কিছুটা উপকার হয়েছে।

মা, আমরা আপনাকে কয়েক হাজার কোটি টাকা দিয়েছি।

হ্যাঁ, দিয়েছো তো। খুব ভালো করেছো। এই টাকায় আগামী নির্বাচন বৈতরণীটা অনায়াসে পেরিয়ে যাবো। তবে তোমরা পথের কাঁটা সরাতে যে খুনটা করেছো, তাতে যে আমি সিঁদুরে মেঘ দেখছি। মুশকিল হল, খুনের তদন্তটা পুলিশের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সিবিআইকে দেওয়া হয়েছে। ওই হারামজাদারা তো এখন দেখছি খুনের তদন্ত করতে গিয়ে চুরির তদন্তটাও করছে। আর এটাই তো মারাত্মক বিপদ। তোমরা যে ধরা পড়ে যাবে। ব্যাটারা বড্ড ধুরন্ধর। তোমাদের ধরে ফেললে, আমাকে নিয়েও টানাটানি করবে। সরকার পড়ে গেলে, রাজত্বটাও চলে যাবে।

Chorer Ma - চোরের মা

মা, রাজত্ব বলছেন কেন, এ আমাদের রামরাজত্ব।

চুপ কর। এটা আনন্দের সময়? আরও ভয়ের কথা যে, সবাইকে জেলের ঘানি টানতে হবে। ফাঁসিও হতে পারে। এখন আমি কী করব? এই যে পুলিশ কমিশনার, হাঁ করে তো শুনছো, কিছু বলছো না?

মা, প্রমাণ তো সব লোপাট করে দিয়েছি,  ভয় কীসের? আপনার নির্দেশ, পরামর্শ মতোই সবকিছু করা হয়েছে। ওই দুঁদে অফিসারগুলো কিচ্ছুটি খুঁজে পাবে না। কেউ ধরাও পড়বে না। কেবল দু-চারটে কেঁচোই ধরা পড়বে।

আরে বোকা পুলিশ কমিশনার, নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সময় নয় এটা। ওরা কেঁচো খুঁড়তে কেউটের হদিস পেয়ে যাবে।

তাহলে এখন কী উপায় মা? আপনি কোন উপায় ভেবেছেন কি?

উপায় আমার ভাবা সারা। যেভাবে লোকজন ফুঁসছে, গণ-অভ্যুত্থানের ভয়টাও করছি। ওদিকে আরেক বিপদ। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলে দিয়েছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বাধা দেওয়া যাবে না। তার মানে, গুলি চালানো যাবে না। কমিশনার, বাধা আমরা দেবোই। আদালতকে আমরা ভুল তথ্য, মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে বোকা বানাবো। তুমি টিয়ার গ্যাস, জলকামান রেডি কর। ইট-পাথরের ঢিল জড়ো কর। ফোর্সকে প্রস্তুত থাকতে বল। রাস্তায় লোহার বেরিকেড বসিয়ে দাও। যাও, ইমিডিয়েট ব্যবস্থা কর। আর যোদ্ধা, ডন, বারুদ,  আনসারুল আনারুল, তোমরা তো দলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তোমাদের এসময় মুখ বুজে থাকলে চলবে না, বিরোধীরা সাহস পেয়ে যাবে।

আমরা কী করবো মা?

তোমাদের ছোবল মারতে বলছি না, ফোঁস্ তো করতে পারো। ওরা যেন জাত সাপের ভয়ে পথে না নামে। এছাড়া এই মুহূর্তে মিছিলের আয়োজন কর। ওদের আগে আমরাই চিৎকার করে বলবো, উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস। সিবিআই, ইডি, তোমরা খুনিকে খুঁজে বের করো, শাস্তি দাও। ফাঁসি দাও। আমরা এই সোনার দেশে শান্তি চাই, শান্তি চাই। এই আওয়াজ সব আওয়াজকে ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলবে।

সেকি মা! আমাদের শাস্তি আমরাই চাইছি?

মূর্খ, বলদ। তোমাদের এই বুদ্ধি নিয়ে রাজনীতি হবে? জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে জনগণেরই কাছের মানুষ হওয়া, এ কৌশল কবে শিখবে?

না মা, আর বকবেন না। বুঝেছি, ঐ যে বললেন, কাঁচের ঘরে বসেই ঢিল ছোড়া উচিত।

(এরপর শুরু হল মিছিল)

মিছিলে সবার আগে মা। তিনিই স্লোগান তুললেন, “নিহতের অপরাধ ক্ষমাহীন।” ক্ষমাহীন, ক্ষমাহীন।

মা, ‘নিহতে’র নয়, ‘হত্যাকারী’র বলুন!

হাজার কন্ঠের কলরব। কে শোনে কার কথা? মায়ের আরও উচ্চকণ্ঠ, “নিহতের ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই।” ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই।

জোরে চেঁচিয়ে এক কর্মী বললেন, মা, ভুল বলেছেন। নিহতের নয়, ‘হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’ বলুন!

এবার মায়ের সম্বিত ফিরল। মিষ্টি হাসি হেসে উচ্চস্বরে বললেন, সরি, ভুল হয়ে গেছে। ওটা নিহতের হবে না, হত্যাকারীর হবে। ছেলেদের কানের কাছে গিয়ে চুপিসারে বললেন, তোমরা আর মূর্খ, বলদটি নেই, জ্ঞান-বুদ্ধি তোমাদের ভালোই হয়েছে।

ঐ দেখুন মা, প্রতিবাদী জনতার ঢল এগিয়ে আসছে। সামনে অগণিত মহিলা। শ্লোগান দিচ্ছে, “হত্যাকারীকে সাহায্য করলো কে?” পুলিশ কমিশনার, আবার কে? “তাইতো বলি, জনতার কথা এক।”  পুলিশ কমিশনার নিপাত যাক। “এই সোনার দেশের শান্তি হনন করলো কে?” আজব মা, আবার কে? “তাইতো বলি, জনতার দাবি এক।” দুর্নীতিবাজ আজব মায়ের পদত্যাগ।

(এরপর দু’টো মিছিল মুখোমুখি)

দু’দিকে রাস্তার উপর শুরু হল অবস্থান। ওদিকে প্রতিবাদী জননেত্রী বক্তৃতা করছেন, বন্ধুগণ, এই আমাদের আজব দেশ। ছিল অতীতে সোনার দেশ। রূপের তাঁর ছিল না শেষ। কিন্তু আজ দুঃখ আমাদের অনেক। এ দেশের সর্বময় কর্ত্রী ‘আজব মা’ দেশ চালাতে সম্পূর্ন ব্যর্থ। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। প্রতিদিন মহিলারা এখানে নির্যাতিত হচ্ছেন। তাদের করুণ আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভরে গেছে। আর আমাদের আজব মা এসব দেখে-শুনেও নীরব। বরং অপরাধীদের বাঁচাতে উনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাই ওনাকে প্রশ্ন করতে চাই, আপনি কি লজ্জা, ঘৃণা, সবই বিসর্জন দিয়েছেন?

এদিকে মা উত্তেজিত হয়ে বক্তব্য শুরু করলেন। “লজ্জা, ঘৃণা, ভয় রাজনীতিতে থাকতে নেই। এই নীতিতেই আমার ক্ষমতায় আসা। মানুষকে আজও আমি, তাই দিতে পারি বুকভরা ভালবাসা। শান্তি আমি চাই, তোমরা চাও অশান্তি। ভুল কিছুই বলিনি। ছোট্ট ঘটনাকে করেছো বড়ো, নিহত দুশ্চরিত্র ছিল কিনা, জেনেছো কি?”

কর্মীদের কপালে হাত। মাকে সতর্ক করল, মা, অগোছালো কথা বলে আবার তো বিতর্কে জড়ালেন। কবিতার ছন্দ মেলাতে গিয়ে বোধ-বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দিলেন।

যা করেছি, বেশ করেছি। ওগো দুষ্টু, দামাল ছেলে যত, যতটা ভেবেছো, ক্ষতি হবে নাকো তত। লোকে যে তোমাদের দুর্যোধন, দুঃশাসন বলে, তাতে কিবা যায় আসে? ডজনখানেক মন্ত্রী আমার জেলে, সেখানে আছে ওরা আদরে-সোহাগে। শিল্প নেই দেশে, কী হয়েছে? শিল্পীরা তো আছে চারপাশে। দেখছো না, অপ্সরাদের নাচন দেখতে কেমন ভিড় জমে?

সময়টা এখন একটু মন্দ, সুযোগ বুঝে লোকেরা দেয় গালমন্দ, দু’দিন বাদে কালো মেঘ কেটে যাবে, রবির আলোয় ছড়াবে ফুলের গন্ধ। রাজনীতি শকুনির পাশা খেলা, দেবো অদ্ভুত পাশার চাল। সাথে আছে বড় উকিল ‘ডি. বটব্ব্যাল’। খেলা হবে, বড় খেলা, সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে, বটব্ব্যালের ইংরেজি সওয়ালে, দেখবে – জজেরা কেমন থরথরিয়ে কাঁপে!

মা লক্ষ্য করুন, এবার ওরা নতুন ঢঙে প্রতিবাদ করছে। ওরা কীর্তন গাইছে। এমন করেও বুঝি নিহতের আত্মার শান্তি কামনা করা যায়! আহা! কী মধুর সুর! ‘রাই জাগো রে, জাগো শ্যামের মনমোহিনী, বিনোদিনী রাই। চেয়ে দেখো, আর তো নিশি নাই।’ ওরা এভাবে মানুষের মনে ব্যথার সঞ্চার করে গণজাগরণ ঘটাতে চাইছে মা। একটা কিছু করুন, নাহলে যে পদত্যাগ ছাড়া আর উপায় থাকবে না।

তাইতো গো, লক্ষণ ভালো ঠেকছেনা। কাতারে কাতারে লোক আসতে শুরু করেছে। কিন্তু আমি তো এই গণ-অভ্যুত্থান হতে দেব না। আমি এখনই রক্ষাকালীর আরাধনায় বসবো। দু’টো ফুল লাগবে আমার। জোগাড় করতে পারবে?

হ্যাঁ মা, সে আর কী এমন কঠিন কাজ! আপনার পাশেই তো অপ্সরাদের ভিড়। রঙিন চশমা চোখে, কানে সোনার দুল। ওদের মাথার চুলে গাঁথা আছে কত রজনীগন্ধা ফুল!

ব্যাস, ওতেই হবে।

(মা করজোড়ে শুরু করলেন রক্ষাকালীর আরাধনা।)

মা, তুমি সকল বিপদ থেকে রক্ষা করো। গণ-অভ্যুত্থান আটকাও মা।

ওং কালী কালী রক্ষাকালী করালবোধিনী দুর্গতিনাশিনী বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী দুর্ভোগং হরণং দেহি নমোহস্তুতে।

ওং হিরিং ভিরিং মিরিং মাতৃরূপেন জগদীশ্বরী বিপদতারিনী দুর্যোগহারিণী  মুণ্ডমালিনী বিল্বপত্রে গন্ধপুষ্পে নমোহস্তুতে।

ওং চণ্ডিকা মহিষমর্দিনী ভবতারিণী অসুরদলিনী কৃপালিনী দেবী গণ-অভ্যুত্থানস্য  ভয়তু অহং হৃদয়ং কম্পিতঃ। তুম বাধাদানং করোতি, তুম বাধাদানং করোতি, তুম বাধাদানং করোতি।

মা চোখ খুলুন। তাকিয়ে দেখুন, লোকেরা ফিরে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের আর ভয় নেই মা।

বলেছিলাম না! বিপদ কেটে যাবে। তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না।

তাহলে তো মা, আমাদের ক্ষতি না হলে আপনারও টিকিটি ছুঁতে পারবে না। কিন্তু মা, জানতে ভারী ইচ্ছা করছে, এই যে উচ্চস্বরে এতসব মন্ত্র আওড়ালেন, রক্ষাকালীও সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের রক্ষা করলেন। তো কোন্ শাস্ত্রে এমন এতসব মন্ত্র আছে?

ভেতরে ভেতরে এত গাধা তোমরা, আমার জানা ছিল না। ওহে, আমাকে কোনো শাস্ত্র পড়তে হয় না। শাস্ত্র আমি রচনা করি। বহু শাস্ত্র আমার মাথায় পুঞ্জীভূত।

মা, মাগো, ধন্য তুমি। তোমার একই অঙ্গে কত রূপ ! তুমিই দেবী দুর্গা, তুমিই কালী, আবার তুমিই সরস্বতী। এই অধম ছেলেদের একটু শিক্ষা দাও মা। তোমার আশীর্বাদে তোমার গাধা ছেলেরা যেন মানুষ হতে পারে।

ও আমার হীরে-সোনারা, মা যে দয়াময়ী। সে কি আশীর্বাদ না করে থাকতে পারে? মানুষ তোমরা অবশ্যই হবে। তবে মনে রেখো, অমানুষও মানুষ, বরং মানুষের চেয়েও ভালো। কেননা, অমানুষকে সহজে বোঝানো যায়, মানুষকে নয়। চল, আর দেরি নয়।  এবার আমরাও ফিরে যাই।

(ছেলেরা মাকে ঘিরে নাচে-গানে আনন্দ করতে করতে ফিরছে। মা-ও নৃত্যের তালে তালে পা মেলাচ্ছেন।)

এই সোনার দেশে আমরা স্বাধীন

আমরা হীরে-সোনা,

যেমন খুশি তেমন চলি

নাই যে কোন মানা।

দারিদ্রকে পায়ে ঠেলে

পকেট ভরি টাকায়,

আলাদিনের প্রদীপ জ্বেলে

ঘুমাই অট্টালিকায়।

মায়ের দেওয়া সঞ্জীবন-সুধা

মেটায় মনের ক্ষুধা,

আপন তেজে ফূর্তি করি

কে দেয় মোদের বাধা?

ধরতে মোদের পিছে ছোটে

ইডি,সিবিআই,

মায়ের কোলে বসে

ওদের বলি, ‘গুড বাই’,

‘গুড বাই’ ….।

……………………………………………………..