Jeeboner Aarek Nam Juddho – জীবনের আরেক নাম যুদ্ধ

(ছোটগল্প)
জীবনের আরেক নাম যুদ্ধ   – হরবিলাস সরকার

বাংলার নীলাকাশের নিচে চরম অরাজকতা। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জনজাতি মানুষেরা সন্ত্রস্ত।

নিস্তব্ধ রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে সিপাই বাইরে বেরিয়েছিল। হঠাৎ অদূরে পাকা রাস্তার উপর একটা গাড়ি এসে থেমে গেল। সিপাই ভালো করে লক্ষ্য করল। তারপর কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ কানে এসে বিঁধল। টর্চের আলোর ছটা এসে তার চোখদুটো ঝলসে দিল। মানুষগুলো দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগলো।

সিপাই হতভম্ব হয়ে ছুটে গিয়ে খোলা বারান্দার আলোটা জ্বেলে দিয়ে স্ত্রীকে চাপা স্বরে ডাক দিল, ঐই সীমা, বিরিৎ মে সে। অকয় চ আবু অরাঃ সে কু হিজু কানা। (এই সীমা, ওঠ কেনে। কারা যেন আমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে।)

ঘুম-চোখে উঠে এলো সীমা। অগোছালো কাপড়টা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল। ইতিমধ্যে জনা তিনেক লোক এসে বাড়ির উঠোনে হাজির। দু’জনের পরনে জিন্সের জ্যাকেট, প্যান্ট। হাতে দামি মোবাইল, মস্তান-বালা। অন্যজনের ভদ্রলোকের বেশ। বালাওয়ালাদের একজন দু’পা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, কে তুই? উঠোনে নেমে আয়।

সিপাই ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। সীমা বারান্দা থেকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ফের প্রশ্ন, তোর নাম কি? সিপাই সরেন আছি,বাবু। কতটা জায়গা আছে তোর? কেনে বাবু? যা বলছি তার উত্তর দে। বাড়তি কথা একদম বলবি না। তিন কাঠার উপর বাড়িটা, আর বিঘা খানেক চাষের জমি আছে বটে। জমির দলিল আছে তো? তা তো আছে, কিন্তু কী হবে, বল্ কেনে? ওঃ গলাটা নামিয়ে কথা বল্।

দ্বিতীয় বালাপরা লোকটা এগিয়ে এসে বলল, কাল বাদে পরশু আমরা এখানে আসবো। তোদের জমি-জায়গা আমরা কিনে নেব। একটা কাগজ নিয়ে আসব। ওটায় সই করে দিবি। না পারলে টিপসই দিবি। আর জমির দলিলটা আমরা নিয়ে নেবো, বুঝলি?

সীমা গুটিগুটি পায়ে এবার নিচে নেমে এলো। বলল, জমি আমরা বেচবো না, বাবু। জমি আমাদের প্রাণ। কে রে তুই, মেয়ে মানুষ? সিপাই, তোর বউ বুঝি? বউ তো আছে বটে, কিন্তু ও ঠিক কথাই বলেছে।

প্রথম বালাপরা লোকটি এবার মেজাজ চড়াল, কী বললি? সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুলটা বাঁকাতে হয়, এই বলে পকেট থেকে রিভলবার বের করে সিপাইয়ের কপালে ঠেকিয়ে ধরল।

পেছন থেকে ভদ্রলোক গোছের মানুষটি চেঁচিয়ে উঠলেন, এই বিট্টু, কী করছিস? পল্টু, ওকে থামা। ম্যানেজার সাহেব, ঘাবড়াবেন না। আমাদের যেটা কাজ, সেটাই করছি।

গুলি চালা, মস্তানবাবু! তবু জমি আমরা দেবো না। নিমেষে বরকে পেছনে ঠেলে দিয়ে বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে সীমা বলল, আগে আমাকে মার, তারপর আমার মরদকে মারবি।

বেগতিক দেখে ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বোঝাতে লাগলেন, তোমরা বোঝার চেষ্টা কর। জমিটা আমাদের দরকার। আমরা তোমাদের ঠকাবোনা। ন্যায্য দাম দিয়ে কিনে নেব।

চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে প্রতিবেশী রমেশ, অভিরাম, আর্নেস, মঙ্গল ছুটে এলো। পেছন পেছন ওদের বউরাও এলো।

ভদ্রলোক পুনরায় বলতে লাগলেন, যাক্ ভালই হল। এক জায়গায় অনেক ক’জনকেই পেয়ে গেলাম। শোনো, একটু আগে যে কথাগুলো বলছিলাম, সেই কথাগুলোই সকলকে আবার বলছি। আমরা জানি, এই ‘কদমপুর’ গ্রামে তোমরা নিরানব্বই ঘর আদিবাসী পরিবার বসবাস করছো। তোমাদের অনেকেরই কিছু কিছু চাষের জমিও আছে। সব মিলে প্রায় দু’শো বিঘা মাটি আছে। সমস্ত মাটিটাই আমরা উপযুক্ত দাম দিয়ে কিনে নেব। আর এই কথাটা, যারা এখানে উপস্থিত নেই, তাদেরকে অবশ্যই বলে দিও।

রমেশ জিজ্ঞেস করল, এ মাটি তোরা কিনে নিলে আমরা কোথায় যাবো, বল্?

ভদ্রলোক উত্তর দেওয়ার আগেই এপাশ থেকে বিট্টু বলে উঠল, তোরা জাহান্নামে যাবি। ওপাশ থেকে পল্টু বলল, তোরা তো আগে বনে-জঙ্গলে ছিলি, ভালোই তো ছিলি। আবার নাহয় চলে যাবি।

এ কেমন কথা বললি বাবু? তাছাড়া বন-জঙ্গল তো দখল হয়ে গেছে। এখন আমরা সেই জীবন পার করে সভ্য সমাজে এসেছি বটে। বাড়িঘর বানিয়েছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা ভদ্র পোশাক পরছে। লেখাপড়া শিখছে, অফিস-আদালতে যাচ্ছে।

ভদ্রলোক এবার শান্তভাবে মধুমাখা কথায় মন জয় করার চেষ্টা করল, না না, সেসবে কোন বাধা নেই। তোমাদের সব সুযোগই থাকবে। শুধু এই মাটিটা আমাদেরকে দিতে হবে। এখানে আমরা একটা ‘ইকো ভিলেজ’ তৈরি করব। এর মধ্যে পার্ক থাকবে, খেলার মাঠ থাকবে। সেখানে এসে তোমাদের ছেলেমেয়েরাও বিনোদন করতে পারবে,  খেলতে পারবে।

কিন্তু বাবু আমরা কোথায় ঘর বানাবো? তোমরা, ওই যে জাতীয় সড়ক চলে গেছে,  ওর নয়নজুলির ধারে ধারে ঝোপঝাড়, জঙ্গল সাফ করে ঘর বানিয়ে নাও। তোমাদেরকে আর টাকা দিয়ে মাটি কিনতে হবে না। এতে তো তোমাদের লাভই হবে।

আর্নেসের বউ ‘ববিতা’ বেশ গলা চড়িয়ে বলে দিল, না বাবু, ওরকম লাভ আমরা করব না। আমরা খেটে খাই। বড় কষ্ট করে এই মাটিটুকু করেছি। জান নিবি তো নিয়ে নে, তবু এ মাটি আমরা তোদেরকে দিবো না।

বিট্টু শূন্যে দু’রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে বজ্রকন্ঠে হুংকার ছাড়লো, পরশু যখন আমরা আসবো, তোরা সবাই তোদের জমির দলিল নিয়ে প্রস্তুত থাকবি।

একটু পরে গাড়িটা যে পথে এসেছিল, সেই পথে চলে গেল। নিশতির প্রহরে ঝিঁঝিদের ডাক জোড়ালো হয়ে উঠলো।

সেই রাতেই সিপাই, রমেশ, ববিতারা গায়ের সকলকে ডেকে বটতলায় জড়ো করলো। গায়ের মাথা বলে সবাই যাকে মানে, সেই মাঝিহারাম ‘সিধো সরেন’ এবার সবার উদ্দেশ্যে বলল, আবুবুইহা মিৎদিন কিশার তাকু আ লেঠ্যেখয় বাগান কু রেয়কেলিয়া। তিহিং আরহ নাওয়াতে দুঃখ আচুর হ্যে কানা। সমাজরে নাওয়ানি কিশাররে বিনাও কানায়। (ভাইসব, একদিন মালিকরা আমাদের থেকে বন কেড়ে নিয়েছিল। আজ আবার নতুন করে বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। সমাজে নতুন মালিকের আবির্ভাব ঘটেছে।)

সিপাই মাঝিহারামের কথার মাঝে বলে উঠল, যাহায় ভদ্দরমানিউ হ্যায় লিনা, উনি ইঞ নেলকাদিয়া। উনি কিশাররেন গড়য়ই মিনায়া। উনি আলেরেন বিধায়ঙ্কের হড় মিনাআঃ কুয়া। ইঞ উঙ্কু মিটান জায়গারে দুরুপ কাতেঃ গালমারাইঞ নেলকাকুয়া।(যে ভদ্রলোক এসেছিল, ওকে আমি চিনি। ও মালিকের ম্যানেজার আছে।  আমাদের বিধায়কবাবুর কাছের লোক আছে বটে। আমি ওদের এক মঞ্চে বসে মিটিং করতে দেখেছি।)

মাজিহারামের চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। হ্যাঁরে সিপাই, বাখায় দঃ উনি মালিকহঃ বিধায়ঙ্কের সুররেন মানিউ কানায়। আর আডি দাড়িয়ান মানিউ। বুঝাওকিঁদাঞ, উনি মালিক আলেয়া হড় আতু হাতাওকু মেনদা। আদ আলে আলেয়া আতু, উরা-দুওয়ার জীয়ি আলায় কাতেইলে বাঁন্চাওয়া। গাপা সিতাখয় আলে দঃ তুণ্ডারে রুয়া, আঃ-সারলে বিনাওয়া, হান্ডিলে নুয়া। মিয়াং নিদঃ উনকুহঃ সাসসাপরাও কাতে কু হিজুয়া। থরা দামতে আলেয়া ক্ষেতকু কিরিং হাতাও কু মেনদাঃ। বাবুন ইমা খায় জোর কাতেকু হাতাও তাবুনা। কাটুপ রিয়া ছাপকু হাতাও তাবুনা।কাগজ কু হাতাও তাবুনা। আলেরেন কুড়ি গিদরা চিতান রে গয়গিডি কুয়া। (হ্যাঁরে সিপাই, তবে তো ওই মালিকও বিধায়কের কাছের লোক বটে। আর খুব শক্তিশালী। বুঝেছি, ঐ মালিকই আমাদের আদিবাসী গ্রামটাকে কিনে নিতে চায়। কিন্তু আমরা আমাদের  ঘরবাড়ি জান দিয়ে রক্ষা করব। কাল সকাল থেকে আমরা মাদল বাজাবো। তীর-ধনুক বানাবো। হেণ্ডি খাবো। পরশু রাতে ওরাও তৈরি হয়ে আসবে। সামান্য দামে আমাদের জমি কিনতে চাইবে। না দিলে জোর খাটাবে। টিপসই নিয়ে নেবে। দলিল কেড়ে নেবে। আমাদের মেয়েদের উপর নির্যাতন করবে।)

সকলে তারস্বরে একযোগে বলে উঠল, বাং বাং বাং, আলে দঃ নওয়া বালে হুই উচুওয়া।(না না না, আমরা কিছুতেই তা হতে দেবো না।)

সকাল হতেই গ্রামে উৎসবের মেজাজ। মাদল বেজে উঠল। আসলে এ এক যুদ্ধের সূচনা।

দিন, রাত পেরিয়ে আবার দিন। তারপর এলো অমাবস্যা তিথির ভয়ঙ্কর কালো রাত। রাত গভীর হতেই অদূরে রাস্তায় অনেক ক’টা গাড়ি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে এসে থেমে গেল। তারপর একদল লোক শুন্যে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগলো।

আদিবাসীরাও প্রস্তুত। সিধো আদেশ দিল, আঁঃ-সার চালাও মে। (তীর চালাও।) মুহূর্তে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর তীব্র গতিতে ছুটে যেতে থাকলো। সঙ্গে অসংখ্য মাদল বেজে উঠছে, আর সবার মুখে জয়ধ্বনি, “শোন্ ওরে দুর্জন, এ মাটি আমাদের জীবন। এই মাটিতেই জন্ম মোদের, মোরা আদিবাসী, নিজভূমে আর হবো না পরবাসী। মরণেরে করিনা ভয়, হবেই হবে আমাদের জয়।”

বেশ কিছুক্ষণ মরণপণ লড়াইয়ের পর হঠাৎ গুলির আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। তারপর গাড়িগুলো গর্জন করতে করতে চলে গেল। এ পক্ষের তীর চালানো বন্ধ হল। ছাত্র-কবি ‘অখিল হেমব্রম’ও লড়াইয়ে সামিল হয়েছিল। তীর-ধনুক রেখে আবৃত্তি করল স্বরচিত কবিতার স্তবক। “আমরা আদিবাসী। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই আমরা বেঁচে থাকি। এই পৃথিবী আমাদেরও। তাঁর বুকের এক টুকরো মাটি এই ছোট্ট ‘কদমপুর’, আমাদের প্রাণ। তাঁকে যে বড় ভালবাসি।” এরপর নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল চারদিক। তারই মাঝে গোটা গ্রাম ভাসলো খুশির জোয়ারে। কন্ঠে সবার বিজয়-সংগীত।

……………………………………………………..