Nibhe Gelo Tara – নিভে গেল তারা

ছোটগল্প (বাস্তব ও কল্পনার আলোকে)  
নিভে গেল তারা   – হরবিলাস সরকার

 

সুতপা এমবিবিএস পাস করেছে। সে ডাক্তার হয়েছে। স্বপ্ন তার সফল। অনাবিল আনন্দের ফল্গুধারা তার জীবন-নদীতে প্রবাহিত হয়েছে। এমন সুখবর সে প্রথম জানালো মা-বাবাকে, “মা, আমি পাশ করেছি। বাবা, আমি ডাক্তার হয়েছি। তোমাদের আশা আমি পূরণ করতে পেরেছি। এতদিনের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।” ফোনের ওপারেও তাই এখন অন্তহীন খুশির হাওয়া।

পাসের সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরল সুতপা। মা বলল, আমার আদরের দুলালি, এবার তবে তোর জন্য পাত্র খুঁজি। বাবা বলল, হ্যাঁরে, মা, সে বেটাকে আমরা ধরে নিয়ে আসবো এ বাড়িতে। সে যে আমার ছেলে রে মা, ছেলে। নিশ্চয়ই আসবে। তোকে আমরা দূরে যেতে দেবো না। সুতপা মিষ্টি হেসে বলল, মামনি, বাবা, জানি, আমি তোমাদের কাছে কত প্রিয়! আমি যে তোমাদের একমাত্র সন্তান। তাই তোমরা আমার জন্য এত করে ভাবছো। এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মেডিকেল কলেজ-হাসপাতালটাও যে আমার কাছে বাড়ি। পাস করার পরেও ছ’মাস বড় ডাক্তারবাবুদের সান্নিধ্যে থাকতে হয়। তাছাড়া রোগীরাও আমার কাছে কত আপন! ওদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারলে আমিও প্রাণ ভরে আনন্দ উপভোগ করি। এটাই তো জীবন। আর একটা কথা মা, এখনই পাত্র দেখো না। আমার লক্ষ্য – আমি যে আরও বড় হতে চাই। সেই স্বপ্ন যেদিন পূর্ণ হবে, সেদিন নাহয় ভাববো সংসার-জীবনের কথা।

মাত্র ক’টা দিন বাবা-মায়ের কাছে থেকে হাসপাতালে ফিরে এলো সুতপা। না,  বিশ্রামের প্রয়োজন নেই। স্টেথো-গলায় বেরিয়ে পড়ল রোগী দেখতে। বয়স্কা এক মহিলা শয্যায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। সুতাপাকে দেখতে পেয়ে সে উঠে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো, ডাক্তার মাগো, তুমি কোথায় গিয়েছিলে? আমাকে ভালো করে দাও মা। হ্যাঁ মাসিমা, আপনি আপনার মায়ের মতো। আপনার মুখে আমি হাসি ফোটাতে চাই। প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে বলল, একটা গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ আমি লিখেছিলাম। ওটা খেলে তো কমে যাওয়ার কথা ছিল। ওষুধটা খাননি মাসিমা? না মাগো, সিস্টার এসে বলে গিয়েছিল, ওষুধটা বাইরে থেকে কিনতে হবে। খুব দামি ওষুধ। কিনতে পারিনি। সে কি? ওষুধটা তো হাসপাতাল থেকেই দেবার কথা। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি দেখছি, এই বলে সুতপা পরিবর্তে অন্য একটা ওষুধ লিখে দিয়ে চলে গেল সোজা চতুর্থ তলায়, অধ্যক্ষের কক্ষের দিকে। কিন্তু প্রহরারত সিভিক পুলিশেরা ঔদ্ধত্য দেখিয়ে আটকালো। বলে দিল,  ম্যাডাম, এখন প্রবেশ নিষেধ। সুতপা ফিরে এসে আবার রোগী দেখায় মনোনিবেশ করল। দূর-দূরান্ত থেকে কত অসহায়,  সম্বলহীন অসুস্থ মানুষ আসে। কত আর্তনাদ ভেসে আসে, ডাক্তারবাবু, আমাকে বাঁচান। আমাদের রোগীকে বাঁচান। করুণ সেই আর্তনাদ সুতপা উপেক্ষা করতে পারে না। কখনও সারাটা রাত জাগে। ঘুমানোর অবকাশ থাকে না।

একদিন জানতে পারল, সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী ‘এমডি’ পড়ার সুযোগ পেয়েছে। মা-বাবার আশীর্বাদ নিয়ে ভর্তিও হয়ে গেল। হাসপাতালে রোগী দেখার পাশাপাশি গভীর অধ্যয়নও চলতে থাকলো। অক্লান্ত পরিশ্রম। শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে, তবুও বিরতি নেই। পরীক্ষায় ভালো ফল করবে, এ-ই এখন ধ্যান-জ্ঞান-তপস্যা।

প্রথম বর্ষটা এভাবেই কেটে গেল। পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্যও পেল। এবার দ্বিতীয় বর্ষ। আরও বেশি পরিশ্রম, আরও কঠোর তপস্যা। কিন্তু মনের ভিতরে একটা প্রশ্ন,  আজও সে উত্তর পায়নি। উত্তর যে পেতেই হবে। প্রহরার বাঁধ ভেঙে একদিন সে ঢুকে গেল অধ্যক্ষের ঘরে। স্যার, রোগীদের থেকে অনবরত অভিযোগ আসছে, অনেক ওষুধ তাদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। অথচ ওই সমস্ত ওষুধ এবং জীবনদায়ী ওষুধ আমাদের হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকার কথা। তাহলে এমন ঘটছে কেন? অধ্যক্ষ উত্তর দিলেন, ডাক্তার হলেও তুমি  একজন এমডি-পড়ুয়া। তোমার এসবে কৌতূহল না থাকাই ভালো, বরং পড়াশুনায় নজর দেওয়াটাই বুদ্ধিদীপ্ত কাজ হবে। অধ্যক্ষর কথা সুতপাকে সন্তুষ্ট করতে পারল না, বরং কৌতূহলটা আরও বাড়িয়ে দিল।

একদিন গভীর রাতে ডিউটি চলাকালে সুতপার চোখে পড়লো – মেডিসিন-রুম থেকে পেটি পেটি ওষুধ নিচে নামিয়ে ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া একটি ট্রাকে তোলা হচ্ছে। তড়িঘড়ি গিয়ে অধ্যক্ষকে জিজ্ঞেস করল, স্যার, ওষুধগুলো যাচ্ছে কোথায়? আজ অধ্যক্ষ উত্তর দিলেন না। বরং ধমক দিলেন,  তুমি ডিউটি করছো না? নজর তোমার রোগীর দিকে না অন্যদিকে?  সুতপা অসাধু কাজের কেমন যেন গন্ধ পেল।

হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ ‘মহেশবাবু’ ঠিক এসময় একদিন কলেজে এলেন। বড় ভালো মানুষ। সুতপাকে খুব ভালোবাসতেন। সুতপাও ভাবল, অপকর্মের কথাটা মহেশবাবুকে নিশ্চিন্তে বলা যায়। বলেও ফেলল। মহেশবাবু অবাক হলেন না। বরং বললেন, যা দেখেছো, সত্য। দুর্নীতির অনেক ডালপালাই জড়িয়ে আছে। অনেক অভিযোগ করেছি, কোনো লাভ হয়নি। তোমাকে বেশি কিছু বলব না মা, তবে এইটুকুই বলবো যে, লোকটি সুবিধার নয়। তোমার উপর কুনজর যখন পড়েছে, একটু সাবধানে থেকো। সুতপা প্রাক্তন অধ্যক্ষের পরামর্শ মতোই চলতে থাকল।

দ্বিতীয় বর্ষের মাঝামাঝি একদিন অধ্যক্ষ তার কক্ষে সুতপাকে ডেকে নিয়ে বললেন,  তোমাকে দশ লক্ষ টাকা দিতে হবে। না দিলে ফেল করানো হবে। সুতপা রাজি হল না। বরং আচমকা প্রতিবাদ করে বসলো, এটা অন্যায়। মেধার অপমৃত্যু ঘটাচ্ছেন আপনি। বুঝেছি, যে আপনার চাহিদামতো টাকা দেবে, সে পাস করবে, ভালো রেজাল্ট করবে।

প্রতিবাদ কাল হয়ে দাঁড়ালো। পথের কাঁটা হয়ে গেল সুতপা। অধ্যক্ষ এই বলে হুঁশিয়ারি দিলেন যে, তুমি যদি আমার ব্যাপারে কুৎসা ছড়াও, তবে ফল ভালো হবে না। দ্বিতীয় বর্ষে নির্ঘাত ফেল করবে। এতেই ক্ষান্ত হলেন না। সুতপার ডিউটির সময়-সীমা বাড়িয়ে দিলেন। একটানা চব্বিশ ঘন্টা, সেটাও বাড়িয়ে ছত্রিশ ঘন্টা ডিউটি।

নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যাস মেয়ের। সারাদিন যা যা ঘটে, লিখে রাখে। মা-বাবাকে এতদিন কিচ্ছু জানায়নি। তবে এবার মাকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখে জানালো, মা, এই ‘আর জি কর’ আমার কাছে সুখকর নয়। এখানে আমি অত্যাচারিত হচ্ছি, মানসিক এবং শারীরিক – দু’ভাবেই। জানিনা, শারীরিক অত্যাচারটা চরমসীমায় পৌঁছাবে কিনা। হয়তো তা হবে অতি নির্মম। ভয় হয়। তবু মনোবল হারাই না। ক্লান্ত শরীরে ঘুম ধরে চোখে। ঘুম-চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে আবার রোগী দেখতে শুরু করি। একটু অবকাশ পেলেই বইয়ের পাতা ওল্টাই। এমডি ডিগ্রীটা আমাকে যে পেতেই হবে। কিন্তু দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তুলেছে অধ্যক্ষের প্রহরায় নিযুক্ত এক সিভিক পুলিশ। সে যে অধ্যক্ষ-ঘনিষ্ঠ। রাতের গভীরে দু’জনে এক টেবিলে বসে মদ্যপান করে। অধ্যক্ষের আশীর্বাদে ওই সিভিক বেশ প্রভাব খাটায়। অবাধ যাতায়াত তার গোটা হাসপাতালে। সুযোগ বুঝে প্রায়ই আমাকে উত্ত্যক্ত করে। একজন ডাক্তারি-পড়ুয়ার প্রতি এমন আচরণ করতে সে সাহস অর্জন করেছে। আমি জানি, অধ্যক্ষের মদত না থাকলে এমনটা হতে পারে না। প্রশাসনের উচ্চ কর্তাব্যক্তিদের মাঝে-মধ্যেই আনাগোনা দেখা যায়। তাই আমি আরও নিশ্চিত, দুর্নীতিগ্রস্ত এই অধ্যক্ষের মাথার উপরে আছে ক্ষমতাশালী সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্বের অকৃপণ আশীর্বাদ। আজ এইটুকুই থাক্। পরের চিঠিতে আরও জানাবো। এখন রাত চারটে। সেমিনার হলে একা আছি। চোখ দু’টো বুঝে আসছে। বেঞ্চের উপর গাটা একটু এলিয়ে দিলাম।

বাড়িতে মায়েরও আজ ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। মোবাইলে কী একটা মেসেজ এসেছে। দেখল, হোয়াটসঅ্যাপে মেয়ের চিঠি। লেখাগুলো পড়ে মা ভয়ে শিউরে  উঠলো। যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো। এত রাতে ফোন করল না। সুতপার বাবাকেও ডেকে কিচ্ছু বলল না। মনস্থির করল,  এক ঘণ্টার রাস্তা মাত্র, কাল বিকেলে মেয়েকে একবার দেখে আসবো। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল, হে ঠাকুর, তুমি ওকে রক্ষা করো।

মেয়েকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে স্বপ্নময় ঘুম এলো মায়ের চোখে। স্মৃতির পাতাগুলো একে একে উল্টে যেতে থাকল। সুতপা তখন ছোট্ট খুকি। আধো আধো কথা বলতে শিখেছে। বড় হতে লাগলো। ভর্তি হল স্কুলে। মেধার স্ফুরণ সেই ছোট্ট থেকেই। শিক্ষক-শিক্ষিকারা একদিন বাড়ি এসে বললেন, আপনাদের মেয়ে অনেক বড় হবে। ছোট্ট সুতপাও বলল, মামনি, বাবা, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব। হ্যাঁ মা, তুমি সত্যিই অনেক বড় ডাক্তার হবে। বাবা বলল, জানিতো, তুমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে।

সত্যিই শিক্ষক-শিক্ষিকা, মা-বাবার আশীর্বাদ বৃথা যায়নি। মাধ্যমিকে রাজ্যের সেরা ছাত্রীদের তালিকায় নাম উঠল। উচ্চ মাধ্যমিকেও সেই ধারা বজায় থাকলো। তারপর যেদিন ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম দশ জনের মধ্যে একজন হল, সেদিন মায়ের চোখে জল। মিষ্টি মুখে তুলে দিয়ে বলল, মা রে, স্বপ্ন তোর সত্যি হল। তুই আকাশের তারা হয়ে জ্বলবি।

ভোর হয়ে আসছে। ঘুমটা ক্ষণিকের জন্য আলগা হতেই মা আবারও স্বপ্ন দেখছে। এবার দুঃস্বপ্ন। সুতপার ভয়ার্ত আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছে।

Nibhe Gelo Tara - নিভে গেল তারা

মা, ঐ তো ওরা ক্ষুধার্ত হায়নার মতো এগিয়ে আসছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, মা। কে আছো? বাঁচাও! বাঁচাও! হে রাত, তুমি সাক্ষী দিও। আমার মা-বাবাকে ব’লো, তোমাদের আদরের মেয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। ভুবন, কেঁপে ওঠো, মানুষের ঘুম ভাঙাও। কালবৈশাখী, তুমি ধেয়ে এসো, হোক তোমার অকাল-বোধন।

ভয়ঙ্কর আর্তনাদে ঘুম ভাঙে মায়ের। বাবা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। মা কেমন করে শান্ত হবে! ওগো, মেয়েকে ফোনটা কর। বাবা বোঝাল, ভোরে মেয়ে এখন ঘুমোচ্ছে। মা বুক চাপড়ায়।

পরের চিঠি আর লিখে যেতে পারেনি সুতপা। ঘন্টা চারেক পরে অধ্যক্ষের ফোন আসে বাড়িতে, “আপনাদের মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।”

……………………………………………………..  

1 thought on “Nibhe Gelo Tara – নিভে গেল তারা”

Comments are closed.