রাজনীতির সংজ্ঞা

(ছোটগল্প)
রাজনীতির সংজ্ঞা  – হরবিলাস সরকার


রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছাত্রকে প্রশ্ন করলেন, রাজনীতির সংজ্ঞাটা কী?

ছাত্র জিজ্ঞেস করল, স্যার, অতীতের না বর্তমানের?

অধ্যাপক কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘রাজনীতি’ রাজনীতি। তার সংজ্ঞা আবার অতীত, বর্তমানের হয় নাকি?

স্যার, কালের নিয়মে সবকিছুই বদলে বদলে যায়।

ছাত্রের কথায় অধ্যাপক এবার বিস্মিত হলেন। ভাবলেন, হয়তো ইতিহাসে রাজনীতির কোন নতুন সংজ্ঞা সৃষ্টি হয়েছে, যা আমার অবগত নেই, ছাত্রটি জেনে ফেলেছে। মাথার সাদা এলোমেলো চুলগুলো দু’হাতে বিন্যাস করে নিয়ে ছাত্রকে এবার বললেন, বলো, তুমি কী জানো।

ছাত্রঃ অতীতের রাজনীতি ছিল –  জনকল্যাণের জন্য ব্যক্তি সম্পত্তিবোধ থেকে মোহমুক্ত হয়ে জীবন উৎসর্গ করা, যেখানে  জনস্বার্থ ছিল মুখ্য, ব্যক্তিস্বার্থ গৌণ। বর্তমানের রাজনীতি হল – নিজে আগে বাঁচো, তারপর অন্যকে বাঁচাও। জীবন উৎসর্গ নয়, প্রয়োজনে জীবন কেড়ে নাও। মিথ্যা কথা বলো, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দাও। প্রতারণা করো আর মানুষকে বিপদে ফেলে জোয়ালে বাঁধো। সাম্প্রতিককালে এর সাথে আরও ক’টা বিষয় যুক্ত হয়েছে। সেগুলো হল –  কাঁচের ঘরে বসে অনবরত বাইরে ঢিল ছোঁড়ো, যাতে অন্য কেউ ঢিল ছুঁড়ে তোমার ঘরটি না ভাঙতে পারে। জোর গলায় কথা বলো, যাতে অন্যের কথা চাপা পড়ে তোমার কথাগুলোই প্রাধান্য পায়। সর্বোপরি ‘গিভ এন্ড টেক পলিসি’, যাকে বাংলায় বলে ‘ফেলো কড়ি, মাখো তেল’। জ্বলন্ত উদাহরণ হল, আজই সকালে খবরের কাগজে পড়লাম – একটা মরার সার্টিফিকেট নিতেও উপঢৌকন দিতে হয়েছে পঞ্চায়েতের কর্তাকে।

উত্তর শোনার পর অধ্যাপক কৌতুহলে ছাত্রটিকে শুধোলেন, তুমি কোন্ রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক?

ছাত্র সহজেই উত্তর দিল, স্যার, আমি সাম্প্রতিককালের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক।

কেন? এইতো তুমি সাম্প্রতিককালের রাজনীতির নিন্দা করলে।

নিন্দার যোগ্য বলেই নিন্দা করেছি। কিন্তু স্যার, ওই রাজনীতিই আমার জীবনকে বাঁচিয়ে রাখবে। আরও তিন জনকে।

কীভাবে?

আহা রে! আপনি এত বড় পণ্ডিত হয়েও বোকা রয়ে গেলেন। আর আমি বোকা হয়েও জীবনের পথ চিনে নিতে ভুল করিনি।  শুনুন তাহলে, আপনাকে বুঝিয়ে বলছি। স্যার, ক্ষমা করে দেবেন আমার এই অদ্ভুত আচরণের জন্য আর অশোভনীয় কথাগুলোর জন্য।

অধ্যাপক ছাত্রের মুখপানে তাকিয়ে রইলেন।

ছাত্র বলতে লাগলো, জানেন, আমি নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলে। সংসারে বড় অভাব। বাবা ট্রেনে ফেরি করে। মা শহরের বাবুদের বাসায় রান্নার কাজ করে। আমার দু’বছরের ছোট একটি অবিবাহিত বোন আছে। বারো ক্লাসের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে যেতে আর সাহস করেনি। দারিদ্র্যের কারণে নয়,  নিরাপত্তার কারণে। ঈশ্বরের আশীর্বাদে ও বেশ সৌন্দর্য নিয়ে জন্মেছে। রাস্তায় বেরোলেই দুষ্টু ছেলেরা পিছে লাগে। ওদের বিরুদ্ধে কারও কিছুই করার সাহস নেই, স্বয়ং দেবতারাও কিছু করতে অপারগ। দেখছেন তো, চোখের সামনে নির্যাতন, খুন হয়। সিবিআই তদন্ত হয়। চারদিকে হইহই রব ওঠে, যেন ফাঁসি হল বলে। তারপর থিতিয়ে যায়। একদিন আদালতের বিচারে ওরা বেকসুর খালাস পায়। এলাকার প্রভাবশালীদের আবার স্নেহধন্য ওরা। রক্ষক পুলিশও আজকাল ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। জানি, আপনি হয়তো বলবেন, চার দেয়ালের বাইরে না বেরোলেও কি তোমার বোন নিরাপদে থাকবে?

আমি বলব, মোটেই না। তবুও যতক্ষণ ওদের নজর এড়িয়ে থাকা যায়। আসলে এ শুধুই মনকে সান্ত্বনা দেওয়া।

যাইহোক, এবার বলি আমার কথা। পড়াশোনায় আমি কোনদিনও মন্দ ছিলাম না। বরাবর আমার পরীক্ষার ফল ভালো। কিন্তু তাতে কী হবে? আমি তো একটা চাকরি পাব না। বাবার টাকার সংস্থান নেই। ব্যবসা করতেও পারব না। এম এ পাস করেও মজুরের কাজ জুটবে না। দেখতেই তো পাচ্ছেন, আমাদের রাজ্যের মজুররা কাজ না পেয়ে ভিন রাজ্যে চলে যায়। এবার বলি, এতটা লেখাপড়া শিখেও কেন আমি চাকরি পাব না। কেননা, চাকরির বাজার এমনিতেই মন্দা। তার উপর যেটুকু হয়, মেধার ভিত্তিতে হয় না, হয় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। ওপরওয়ালাদের পকেট ভরাতে পারলেই চাকরি নিশ্চিত।

অধ্যাপক মৃদু হেসে বললেন, বুঝেছি, তুমি শাসক-ঘনিষ্ঠ হতে চাইছো কেন। যাতে কোন নেতার কৃপায় একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারো।

না স্যার, চাকরির ব্যবস্থা আমার হবে না।  দিনকাল বদলেছে। ওদের ঘরের লোককেও এখন একটা কাজ পেতে হলে মোটা টাকা চাঁদা দিতে হয়। আপনি আবারও ভুল করলেন। আপনি বুঝতে পারলেন না, আমাকেও চিনতে পারলেন না।

এবার যদি এটাও ভেবে নেন যে, রাজনীতি এখন আখের গুছিয়ে নেবার কারবার। আপনার ভাবনায় কোন ভুল নেই। আমি আপনার ভাবনাকে পূর্ণ সমর্থন করছি। সত্যিই তো কর্মহীন ছেলেমেয়েরা দলে দলে  ক্ষমতাসীন দলে ঢুকে পড়ছে। একটা টিকিট পেয়ে ভোটে একবার জিততে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যায়। টাকার পাহাড়ে শুয়ে দিন কাটানোর স্বপ্নে বিভোর হয়। ভোটে যারা টিকিট না পায়, তারাও ব্যর্থ হয় না। নানা প্রলোভনের জাল বিছায় চারপাশে। সেই জাল গুটিয়ে তুলে আনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। কিন্তু আমি স্যার গোবেচারা একজন ছাত্র-যুবক। ওই অন্যায়-অধর্মের পথে চলবার বিন্দুমাত্র স্পৃহাও আমার মধ্যে নেই। তবু আমি চলমান স্রোতে কেন নিজেকে ভাসিয়ে দিতে চাই?

শুনুন তাহলে, বুঝিয়ে বলছি। অতীতের নিঃস্বার্থ সৎ ও মানবিক গুণাবলীর আধারে গড়ে ওঠা সমাজ কল্যাণে উৎসর্গকৃত মহামানবেরা আমার হৃদয়ে নিভৃতে লালিত-পালিত। কৈশোরে স্বপ্ন দেখতাম, আমি তাঁদের যথার্থ উত্তরসূরি হব এবং বিকাশের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে মানুষকে মুক্তির পথ দেখাবো। সেই স্বপ্ন আমি বুকে পাথর-চাঁপা দিয়ে রেখেছি। এখন সাম্প্রতিক শাসকের ধ্বজা হাতে নিয়ে ওড়াতে চাই। আপনি আমাকে নিকৃষ্ট, সমাজের কুলাঙ্গার, যাই বলুন না কেন, আপনার সব অপবাদ আমি নীরবে অশ্রুনয়নে মাথা পেতে নেব। ইতিহাস আমাকে ক্ষমা করবে না, জানি। তবু তো আমার বোনটা বর্বর ক্ষুধার্ত হায়নাদের মহা গ্রাসের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। অন্ততঃ কিছুকালের জন্য তো শান্তিতে বাঁচতে পারবে। মা-বাবাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দিন কাটাতে পারবে।  অশেষ দুঃখের সংসারে সেটুকুও তো অনেক।

আপনাকে এমনকরে কেন বললাম? অথচ আমি যে দিন-রাত দুঃস্বপ্ন দেখি। চোখের সামনে অজানা ভবিষ্যৎ নিদারুণ হয়ে ফুটে ওঠে। আপনি কি জানতে চান?

হ্যাঁ বাবা, বলো তুমি।

একদিন দেখতে পেলাম – আমি মানুষের মুক্তির পতাকা নিয়ে হেঁটে চলেছি পথে পথে। পেছনে মুক্তিকামী অনেক লোক। সবার মনে দৃঢ় সংকল্প। ভালো চোখে দেখল না শাসক আর তার অনুগামীরা। বন্দুক তাক করে তেড়ে এলো শত শত পুলিশ। রক্তাক্ত হলাম। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলাম। আমাকে নিয়ে যাওয়া হল গারদে। জামিন অযোগ্য ধারায় মিথ্যা মামলা সাজানো হল। তথাপি আমি দুর্বল হলাম না। রাত নেমে এল। ঘুম ধরল না চোখে। ভাবতে লাগলাম, আমি শহিদ হতেও পারতাম। তাতে অবশ্য মঙ্গলই হত। এক বিরাট আন্দোলনে বাংলার মাটি কেঁপে উঠতো। অমাবস্যার অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষগুলো জেগে উঠতো। নতুন সুন্দর সমাজ গড়ার প্রেরণায় তারা উদ্বুদ্ধ হতো। ……..।

একসময় ভোরের আলো ফুটে উঠল পূর্ব আকাশে। করুণ আর্তনাদ আমার কানে ভেসে এলো। উপেক্ষা করতে পারলাম না। গারদের উঁচু পাঁচিল টপকে বেড়িয়ে এলাম। প্রহরীরা আমাকে ধরে ফেলল। তাকিয়ে দেখলাম, দুষ্টু ছেলেরা বর্বর ক্ষুধার্ত হায়নার মতো আমার বোনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নিরুপায় বোনটি ‘বাঁচাও’, ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছে। অসহায় মা-বাবা পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে এসেও রক্ষা করতে পারল না। মেয়ের উপর পাশবিক নির্যাতন দেখে, যন্ত্রণায় মানুষ দু’টো পাগল হয়ে গেল। আর আমি, অঝোরে শুধুই অশ্রু ঝরালাম।

বেলা বাড়তেই আমাকে আদালতে তোলা হল। বিচারক দু’সপ্তাহের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিলেন। মেয়াদ শেষে আবারও দুই সপ্তাহ। ক্রমে আরও তিন সপ্তাহ, চার সপ্তাহ। মুক্তি মিলল না। বিচারক আবারও এক মাসের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিলেন ।

একদিন জেলের ভেতরে খবর পেলাম, মা-বাবার অবস্থা ভালো নয়। সরকারি আর্থিক সাহায্যটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম। এক আধিকারিকবাবু ছুটে এসে সুখবর দিলেন, তোমার জামিন হয়ে গেছে। কার দয়ায় এমনটা হল কিছুই বুঝতে পারলাম না।

সকাল হল। দেখলাম, এলাকার প্রভাবশালী নেতা এসেছেন আমাকে নিয়ে যেতে। আমার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। আর কানে কানে পরামর্শ দিলেন, বিপথে  পা বাড়িও না ভাই, বিপদ হতে পারে। এমন সময় ঘুমটা ভেঙে গেল। দেখি – আমি, আমার বোন, মা-বাবা বসে আছি টালির চালার নিচে খোলা বারান্দায়। শীতের সকালে রোদ পোহাচ্ছি আর সুখ-দুঃখের কথা বলছি। স্বপ্নের কথা ওদেরকে বলতে পারলাম না।

স্যার, এখানে দুঃস্বপ্নই বাস্তব, বাস্তবই দুঃস্বপ্ন হয়ে আসে। সত্যিই আমার বড় নির্মম কিছু একটা ঘটে গেলে ওরা অসহায় হয়ে পড়বে। আমার আপাদমস্তক অদৃশ্য কাঁটার শেকলে বাঁধা। সেই বাঁধন ছিন্ন করবার সাধ্য আমার নেই।

অধ্যাপকের কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। তাঁর ভেতরটা দুঃখ-ব্যথায় উন্মত্ত হয়ে উঠল। হাজার প্রশ্ন, “কবে, কবে এই ক্লেদময় সমাজের অবসান হবে? ছাত্রটি আর তার পরিবারের পরিণতি কী হবে ? ……?” ভাষা অস্ফুট হলেও বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশে মন তা বুঝে নিল। অধ্যাপক এরপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ছাত্রটিকে কোমল স্বরে বললেন, “তুমি বসো”।


…………………………………………………….