গল্প
(বাস্তবের প্রেক্ষাপটে, কল্পনার মিশ্রণে)
দারিদ্র্য
হরবিলাস সরকার
(দ্বিতীয় পর্ব)
* অভিশপ্ত কালো দিন *
ঠিক দু’মাস পর, দুর্ভাগাদের মুখের জয়ধ্বনি ক্রন্দন ধ্বনিতে পরিণত হয়ে প্রকৃতির বুক বিদীর্ণ করে তুলেছে। মনিশঙ্কর ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছেন। কিন্তু যে দয়ালু এবং পরহিতব্রতী মন নিয়ে করজোড়ে মানুষের কাছে ভোট ভিক্ষা করেছিলেন, সেই রূপ তিনি গিরগিটির মতোই দ্রুত বদলে ফেলেছেন। তবে ছলে-বলে-কৌশলে তাঁর জিত হলেও দল জিততে পারেনি।
সরকার বদল হয়েছে বিপুল দুর্ভাগ্যপীড়িত মানুষের সমর্থন নিয়ে। কিন্তু হায়! তাদের দুর্ভাগ্যের বদল হয়নি। জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। প্রতিশ্রুতিগুলো নির্লজ্জভাবে ফিরিয়ে নিয়েছে মানুষের ভোটে জেতা নতুন সরকার। ঘরে ঘরে আশাভরা বুকে শুধুই নিরাশার বেদনা এখন। অথচ সরকার বহু লক্ষ কোটি টাকা করের ছাড়পত্র দিয়েছে মালিক গোষ্ঠীকে। তাঁদের অট্টালিকায় খুশির জোয়ার।
জনগণ প্রশ্ন তুলল, সরকার তুমি কাদের? চায়ের দোকানে, অলিতে-গলিতে সবার মুখে একই কথা, কোনো বদল হয়নি, শুধু পোশাকের রঙটা বদল হয়েছে। সব শাসকেরই চরিত্র এক। সবাই ‘গরিবি হটাও’ বলে ক্ষমতায় আসে, গরিব সর্বস্ব হারিয়ে আরও গরিব হয়। জনগণের পাশে থাকা লড়াকু পোড়-খাওয়া নেতা বলেন, ভোটে সরকার পাল্টায়, শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়নের নিরসন হয়না।
ওদিকে বিধায়ক মনিশঙ্কর মজুমদার দলত্যাগ করে নবগঠিত সরকারে যোগ দিয়েছেন। তাঁর চালকলে শুরু হয়েছে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ। আকাশ বাতাস ভরে উঠেছে দুর্ভাগা শ্রমিকের আর্তনাদে। মালিক, আমরা খিদে পেটে কল চালাতে অপারগ। দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে আমরা নিরুপায়, মৃত্যুপথযাত্রী।
মালিক কর্ণপাত করলেন না, বরং পয়লা মে তারিখে সারা দেশব্যাপী যখন শ্রমিক দিবস পালিত হচ্ছে, তখন চালকলের ফটকে জনা দশেক কর্মচারীর ছাঁটাইয়ের নোটিশ টাঙিয়ে দিলেন। তাদের মধ্যে প্রথমেই আছে মনসুর, সিরাজুল, মৃত্যুঞ্জয় ও হারাধনের নাম। আজ ছুটির দিন হলেও সকলেই চালকলে এসেছিল উৎসবের মেজাজে। কিন্তু নোটিশটা দেখামাত্রই সকলের আনন্দ কর্পূরের মতো উড়ে গেল। মনসুর অনন্যোপায় হয়ে ছুটে গেল স্বদেশদার কাছে। সিরাজুল, মৃত্যুঞ্জয়, হারাধনও ছুটে গেল। কাতর হয়ে বলল, আমরা ভুল করেছিলাম স্বদেশদা, ক্ষমা করে দাও। স্বদেশের হৃদয়-আকাশে জমে থাকা কালো মেঘের বুক চিরে ঝলমলিয়ে উঠল রক্তিম সূর্য। সেই আনন্দের ফল্গুধারায় উজ্জীবিত হয়ে সে বলল, না মুনসুর, সিরাজুল, মৃত্যুঞ্জয়, হারাধন, না, ভুল তো তোমরা করোনি, তবে ক্ষমা চাইছো কেন? দারিদ্র্যের নিরন্তর কষাঘাতে তোমরা যে দিশেহারা। একটু সুখের আশায় মরীচিকার পেছনে ছুটে যাও। ব্যর্থতার নিদারুণ ব্যথা নিয়ে ফিরে আসো বারবার। এতে তোমাদের দোষ কি? এ যে জরাজীর্ণ, মুমূর্ষু সমাজের অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় কী, জানো? সমাজটাকে ভাঙতে হবে। তারপর নতুন করে গড়তে হবে। যদি আরও দুঃসহ যন্ত্রণা, নিদারুণ দুঃখকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত থাকো, তবে শপথ নাও — আগামীকাল থেকে চালকলের চাকা আর ঘুরবে না। ক্ষুধার্ত মানুষগুলো এক সুরে চিৎকার করে বলে উঠল, চালকলের চাকা আর ঘুরবে না।
রাত পোহালো। দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে সকলে এসে পৌঁছাল চালকলের দরজায়। শ্রমিকদের সাথে জড়ো হল শত শত সাধারণ মানুষও। শ্রমিকেরা শীর্ণ গলায় গগনভেদী আওয়াজ তুলল, মালিক, তুমি আমাদের কাজে পুনর্বহাল কর। ন্যায্য মজুরি দাও।….।
খবর পাওয়ামাত্রই পুলিশ, রেডিকাল বাহিনী সিংহগর্জনে ছুটে এল। তারা কোনো কথা, কোনো অনুরোধ শুনলনা। লাঠি উঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া শ্রমিকরা আজ আর পিছু হটলনা। খালি হাতে প্রতিরোধ করছে অদম্য মনোবল নিয়ে। রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে স্বদেশ লক্ষ্য করল এক কোনে উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন কমরেড অনিরুদ্ধ সেন এবং জেলা সম্পাদক কমরেড জ্যোতির্ময় সাহা। স্বদেশ ভিড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে গেল সেদিকে। কমরেড সাহা, কমরেড সেন আপনারা? পুলিশ আপনাদেরকে লক্ষ্য করছে। কমরেড সাহা বললেন, না স্বদেশ, ওরা আমাদের স্পর্শ করবে না। ওদের প্রথম টার্গেট তুমি। কারণ, তুমি এই আন্দোলনের মধ্যমণি। দ্বিতীয় টার্গেট মনসুর, সিরাজুল, মৃত্যুঞ্জয়, হারাধন। একথা তোমাকে জানাতেই আমাদের আসা। কিন্তু কোনোমতেই পিছু হটবে না। শুধু সবাই একটু সাবধানে থেকো। সাবধান! টি. আর গ্যাসের সেল ফাটানো হচ্ছে। সাহার ইশারায় পেছন থেকে চার যুবক অসংখ্য ভেজা ন্যাকড়া নিয়ে এগিয়ে এল। ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল। স্বদেশ উচ্চমাত্রায় গলা চড়ালো — বন্ধুগন.., তোমরা সবাই ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে চোখ মুছে নাও, চোখ জ্বলবে…।
জ্বালাজনক ধোঁয়ায় ভরে গেছে গোটা এলাকা। তথাপি ভুখা শ্রমিকরা পিছু হটল না। পুলিশ শুন্যে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ল। কিন্তু তাতে যেন শ্রমিকদের জেদ আর তেজ আরও বেড়ে গেল। আবেগঘন মুহূর্তে দারিদ্র্যের যন্ত্রণাভরা করুণ সংগীত বেজে উঠল ক্ষতবিক্ষত হৃদয়তন্ত্রীর তারে তারে —
মৃত্যুকে আমরা পরোয়া করিনা ,
আমরা মৃত্যুঞ্জয়,
যতই তোমরা আঘাত হানো,
মানবনা পরাজয়।
মৃত্যু আছে জানি শিয়রে দাঁড়িয়ে,
এগিয়ে চলেছি তবু উচ্চ শিরে,
মহা প্রলয়ের ভূমে
নতুন ইতিহাস লিখব বলে,
নেই আজ মরণের ভয়।
দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর অভিশাপে
প্রতিদিন হই ক্ষয় তিলে তিলে,
আসুক বরং মৃত্যুর সমন
হোক তবে শহিদের মৃত্যুবরণ, বেজেছে ঐ যুগের শঙ্খ,
এসেছে যুদ্ধের শুভলগ্ন,
আজ নয়তো কাল
মরণ সবারই হয়,
চিরজীবী কেউ নয়।
শুরু হল গুলিবর্ষণ। জীবনযুদ্ধের গান আরও জোরালো হয়ে সাধারণের কন্ঠেও অনুরণিত হতে লাগল।
আমাদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে
উঠবে নতুন সূর্য,
দীপ্ত কিরণে পুড়ে লয় হবে
যত শোষণের দুর্গ,
দিকে দিকে ঐ উঠেছে কলতান,
গড়বো আমরা নতুন ভুবন,
মানুষের ইতিহাস রচনায়
জীবন বলি যদি দিতেই হয়,
নেই আজ মরণের ভয়।।
একটা গুলি স্বদেশের বুক লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশ দিয়ে এক দলা মাংস খুবলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। হারাধনের পায়ে, মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে গুলি লেগেছে। সিরাজুলের মাথার খুলির বেশ কিছুটা অংশ চিরে দিয়ে একটা গুলি ছুটে গেছে। ওরা যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়ে কাতরাচ্ছে। কিন্তু ‘মা’ বলে একটিবার অমন করুন সুরে চিৎকার করে উঠল কে? মনসুরের ঊনিশ বছরের ছেলেটা বাবাকে আড়াল করবার জন্য ছুটে এসে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল সামনে। ওর হৃদযন্ত্রটা ফেড়ে দিয়ে মারণ গুলিটা বেরিয়ে গেছে।
মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল রণক্ষেত্র। রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। কমরেড সাহা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে এলেন মাটিতে লুটিয়ে পড়া রক্তস্নাত নিস্তেজ ছেলেটির কাছে। অশ্রুসজল নেত্রে চিৎকার করে উঠলেন, কোথায় ভুখা মানুষের ভোটে জেতা বিধায়ক মনিশঙ্কর মজুমদার, এ-ই কি তার প্রতিদান? আপনার বিচার হবে মানুষের আদালতে। কাল রাজ্য জুড়ে কোটি কোটি মেহনতি দীন-দুঃখী মানুষ পথে নামবে।
মনসুর নিদারুণ শোকের মাঝেও বুকে পাথর চাপা দিয়ে অশ্রুনয়নে হাসতে হাসতে প্রবল চিৎকার করে উঠল, মালিক…., এতকাল তোমার চালকলে কাজ করেছি, আজ বিদায়কালে প্রতিদানে ফুলের মতো সুন্দর জীবন উপহার দিয়ে গেলাম। …..। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেলার পুলিশের বড়কর্তা আরও বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির হয়েছেন। জেলা শাসক এসেছেন। অ্যাম্বুলেন্স এসেছে।
সীমাহীন বেদনার খবরটা অতি দ্রুত কে যেন পৌঁছে দিয়েছিল মনসুরের বাড়িতে। দুজন প্রতিবেশিনী তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে এসেছে। ছেলের পাশে তাকে বসিয়ে দিল। দুঃসহ শোকে মায়ের বুকটা পাথর হয়ে গেছে। সেই পাথর-প্রতিমা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বড় আদর করে বলছে, ইস! খিদের জ্বালায় বেটা আমার ঘুমিয়ে পড়েছে। চল্ বেটা, বাড়ি চল্, খেয়ে নিবি। তোর জন্য কলমি শাক রান্না করেছি, কুমড়ো ফুলের বড়া করেছি। কতদিন হল! ভালো কিছু খেতে পাসনি। আজ ঘোষের কাছ থেকে এক পোয়া দুধ কিনেছি। পায়েস করেছি, খাবিনা? ……..।
…………………………………………………………