দারিদ্র্য

গল্প (বাস্তবের প্রেক্ষাপটে, কল্পনার মিশ্রণে)
দারিদ্র্য – হরবিলাস সরকার
(প্রথম পর্ব)

কেমন আছো, মনসুর? না দাদা, ভালো নেই। চালকলে কাজ করি, যা মজুরি পাই, ও দিয়ে কি আর ভালোভাবে সংসার চলে? মালিক ফুলেফেঁপে উঠছে, আর আমরা মজুরখাটা মানুষগুলো ক্রমশ নিচে তলিয়ে যাছি।

দারিদ্র্য তোমাদের কাছে অভিশাপ, কিন্তু তোমাদের মালিকের কাছে আশীর্বাদ। মনসুর কিছুক্ষণ স্বদেশদার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁগো দাদা, এ কেমন কতা, দারিদ্র্য আবার আশীর্বাদ হয় নাকি? তা তো সবার কাছেই অভিশাপ।

স্বদেশ মানেটা ভেঙে বোঝালো না। মনসুরের পিঠখান চাপড়ে দিয়ে বলল, চা খাবে? অকাল বার্ধক্যে কোঁচকানো সরলতা মাখানো মুখখানায় এক চিলতে হাসি নিয়ে বলেই ফেলল, তা একটু খেলে মন্দ হয় না। সকালে আজ চা খাওয়া হয়নিকো। ভোরে উঠে বউ বলল, চা বাড়ন্ত, আনতে হবে। ভাবলাম, হারু মুদি ধারে দেয় কিনা দেখি। তাইতো ওর দোকানে যাচ্ছিলাম দাদা। পথে এই যে তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল। আমার সংসারের অভাবের কথা শুনেই তুমি তো গল্পের আসর জমিয়ে বসলে।

ঠিক আছে, চলো ভাই রামপ্রসাদের দোকানে। চলো তাহলে। তবে কী দাদা, রামপ্রসাদ চা-টা ভালোই বানায়। মনসুর, তুমি সকালে নিশ্চয়ই জলখাবারও খাওনি। তাই দুটো বিস্কুটও খেয়ে নেবে। মনসুর খুশিমনে এগিয়ে চলে।

ফেরিঘাটের পাশেই রামপ্রসাদের চায়ের দোকান। সেখানে গিয়ে বসল স্বদেশ আর মনসুর। এমনসময় ও পাড়ার হারাধন, মৃত্যুঞ্জয়, সিরাজুল এসে হাজির। ওরাও চা খাওয়ার নিমন্ত্রণ পেল।

হারাধন চা বানাতে বানাতে রসিকতা করে বলে বসল, কী ব্যাপার স্বদেশদা? আজ সবাইকে চা খাওয়াচ্ছো দেখছি! কেন ভাই, রোজ খাওয়াতে পারি না ঠিকই, তাই বলে কি একটা দিনও খাওয়াতে পারবো না? চা আমি আজ তোমাকেও খাওয়াবো। বেশ, খাওয়াও তাহলে। রামপ্রসাদ, জানোই তো, আমি তোমাদের থেকে বয়সে বড় হলেও বন্ধুর মতো। বাবা ছোটখাটো একটা চাকরি করতো। মা এখন ফ্যামিলি পেনশনটা পায়। ঐ সামান্য টাকাতেই আমার আর মায়ের চলে যায়। হ্যাঁ, এটা ঠিক, তোমাদের অবস্থা আরও করুন। মনসুর, হারাধন, মৃত্যুঞ্জয়, সিরাজুল, এরা কালীচরণ সাহার চালকলে লেবারের কাজ করে। একদিন কাজে না গেলে মালিক সেদিনের মজুরি দেবে না। এই যে তুমি চা বেচছো, একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে তোমার সংসারও চলবে কি? তাও রক্ষা যে, তোমার বউ তোমাকে সহযোগিতা করে। তোমার মতোই ভালো চা বানায়। তুমি একটা দিন না এলে ও ঠিক চালিয়ে নেয়। এদের বউরাও কেউ সদরে বাবুদের বাসায় কাজ করে, কেউ বাড়িতে ডালের বড়ি, পাপড় বানায়, কেউ গ্রামের ভেতরে ছোটখাটো একটা দোকান দিয়ে বসেছে। সরকারের থেকে অভাবী মহিলারা দেড় হাজার টাকা ভাতাও পায়। যাইহোক, ভালো কিছু না হলেও সংসারের ঠেকা দেবার কাজটা তো হয়। রামপ্রসাদ স্বীকার করল, এ তুমি ন্যায্য কথাই বলেছো দাদা। হারাধন জোর দিয়ে বলল, গরিবের দুঃখ তোমরাই তো বুঝো। সারাদিন দেশের কাজ কর, গরিব মানুষের হয়ে কথা বল, তুমিই আমাদের প্রকৃত বন্ধু, দাদা। মনসুর বলল, স্বদেশদা কষ্ট করেই দলটা করে, মানুষের পাশে পাশে থাকে। মৃত্যুঞ্জয় বলল, দ্যাশে একটা মাত্রই দল আছে, আসল গরিবের দল, বাকিরা গরিবের কথা মুখে যতই বলুক – সবাই বড়লোকের দল। সিরাজুল একটু অন্যকথা বলল, দলটা করা খুব মুশকিল, লড়াইটা ভীষণ কঠিন। কঠিন বলেই তো গরিব মানুষ সহজে ঘেঁষতে পারেনা।

স্বদেশ হেসে হেসে বলে, কেন ভাইয়েরা, এই তো তোমরা আমার পাশেই আছো, বন্ধুর মতোই আছো, এর বেশি আর কী চাই? এরপর চায়ে চুমুক দিয়ে একটু গম্ভীর হয়ে বলল, সত্য বড় কঠিন। আমাদের লড়াই সেই সত্যের জন্য। এ লড়াই দেশের গরীব, খেটে খাওয়া মানুষের জন্য। দেশে তাদের সংখ্যাটাই বেশি। তারা যদি তাদের সঠিক জায়গা চিনে নিয়ে একত্রিত হয়, তাদের অধিকার তারা এক লহমায় ছিনিয়ে নিতে পারে, দুনিয়াটাকে বদলে দিতে পারে।

মনসুর বলে, দাদা, তোমাকে একখান প্রশ্ন করি, এই যে তুমি অধিকারের কথা বললে, আচ্ছা বলতো – আমাদের আবার কী অধিকার আছে? তাই না রে সিরাজুল, মৃত্যুঞ্জয়, হারাধন, বল না তোরা? মনসুরের কথায় একমত হয়ে সিরাজুল বলল, হ্যাঁ দাদা, সব অধিকার তো বড়লোকের, আমরা তেঁনাদের দয়াতেই বাঁইচা আছি। হ্যাঁ স্বদেশদা, ওরা ঠিক কথাই বলেছে। বেঠিক কিছু বলেনি। মালিক চাইলে আমাদের কাজে রাখতে পারে, না চাইলে তাড়িয়েও দিতে পারে। হারাধন সবার কথা মন দিয়ে শুনছিল। মৃত্যুঞ্জয়ের বলার পরে এবার সেও বলে উঠল, এদের কথায় আমিও একমত। এই যে ধর, সরকার দ্যাশের গরিব, পিছিয়ে পড়া মানুষকে, মহিলাদেরকে ভাতা দিচ্ছে, এটা তো দয়ার দান। না দিলে এতে কি আমাদের কোনো অধিকার আছে?

স্বদেশ ভ্রু কুঁচকে গোল গোল চোখে মৃদু হাসল। তারপর ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলল, তোমরা বাস্তবে দেখছো – সরকার কিছু সাহায্য দিচ্ছে, আসলে তা এমনভাবে প্রচার করা হয়, যেন সরকার কত মানবিক! তাঁদের নিজেদের পকেট থেকে দিচ্ছে। তোমরা সেটাকে ‘দয়ার দান’ ভাবছো। কিন্তু তা নয়। তা আমাদেরই দেওয়া করের টাকা অর্থাৎ তুমি-আমি-সকলে পরিশ্রম করে যা অর্জন করি, তার একটা অংশ, যা সরকারের কোষাগারে গিয়ে জমা হয়। এতে তো সকলেরই অধিকার আছে। আছে কিনা? মাথা নাড়ে সকলে। বলে, হ্যাঁ দাদা, তুমি ঠিক কথাই বলেছো। স্বদেশ ক্ষান্ত হল না, আবারও বোঝাতে লাগল, তাহলে শোনো, এবার একটু অন্যভাবে বলি — এই যে তোমরা চালকলে কাজ করছো, ধান থেকে চাল তৈরি করছো, এতে মালিকের কোনো পরিশ্রম নেই, সব পরিশ্রম তোমাদেরই। তাহলে এই সম্পদের মালিক তোমরাই। অথচ চাল বিক্রি করে মালিক যা লভ্যাংশ পান, তার অতি ক্ষুদ্র অংশ তোমাদেরকে দেন। বাকি সব ঢোকে তাঁর পকেটে। আবার চাষীরা কত কষ্ট করে গাঁটের টাকা খরচ করে, ধার-দেনা করে ফসল ফলায়। সেই ফসল ঐ মালিক কিনে নেন খুবই কম দামে। বঞ্চিত হয় চাষিরা। আর এভাবেই মুনাফার অর্থাৎ পুঁজির পাহাড় বানায় মালিক। এই যে মুনাফা — এ তো আসলে চাষীদের আর তোমাদেরই পরিশ্রমের ফসল।

কথাগুলো মনসুরের ভেতরে গেঁথে যায়। সে এবার বলে, স্বদেশদা গো, বুঝেছি। তাহলে তো কারখানায় যে শ্রমিক সার তৈরি করে, কীটনাশক তৈরি করে, চাষীরা সেসব চাষের জন্য কিনে আনে। ঐ শ্রমিকদেরও নিশ্চয়ই ওই মুনাফার মধ্যে অংশ আছে, তাই নয় কি? মৃত্যুঞ্জয় সায় দেয়, মনসুর ঠিক কথাই বলেছে। সিরাজুল বলে, তাহলে তো যে চাষী ট্রাক্টর দিয়ে জমি চষে দেয়, শ্যালোর জল দিয়ে অন্য চাষীকে সাহায্য করে, তারও ওই মুনাফায় অংশ আছে। হারাধন বিষয়টা আরও পরিষ্কার করে বুঝে নিতে চায়। সে এবার মনসুর, মৃত্যুঞ্জয়, সিরাজুলকেই প্রশ্ন করে — ভাইসব, কারখানায় যিনি ম্যানেজারি করেন, যিনি হিসাবের কাজ করেন, আবার যে ব্যক্তি গাড়িতে মাল বহন করে, তারাও তো তবে সমান অংশীদার? এরপর স্বদেশদাকেও প্রশ্ন করে, আচ্ছা দাদা, যেসব জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা চালকল, ট্র্যাক্টর আবিষ্কার করেছেন, যেসব পণ্ডিত ব্যক্তিরা চাষীদের চাষের কাজে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাঁদের সবারই তো পরিশ্রম আছে। এই যে তুমি, তোমাদের লোকজন আমাদের জন্য লড়াই, আন্দোলন করছো, তোমাদেরও তো সমান অবদান আছে।

হ্যাঁ ভাই, সবাই আমরা শ্রমিক। এই পৃথিবীতে যা-কিছু সৃষ্টি হয়েছে, সে সবকিছুর মূলে আমরাই। অথচ দেখ — সব দুঃখ-কষ্ট আমাদেরই। সবকিছুতে অধিকার থেকেও আমাদের কোনো অধিকার নেই।

রামপ্রসাদ খদ্দেরের চা বানাতে বানাতে এতক্ষণ মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিল। এবার উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, না, আমরা মানব না। অধিকার আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে। বাকিরাও একযোগে চিৎকার করে বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে।

স্বদেশ দুহাত তুলে বলল, থামো, আমাদের ন্যায্য অধিকার আমাদেরকেই বুঝে নিতে হবে। কিন্তু এভাবে এখনই উত্তেজিত হলে হবেনা। সুবিশাল পর্বতকে উপড়াতে গেলে কী পরিমাণ বলের দরকার, জানো? সেই বল, সেই শক্তি আমাদের নেই, অর্জন করতে হবে।

রামপ্রসাদ আবেগে টগবগ করতে করতে বলে উঠল, কেন গো স্বদেশদা, একটু আগে তুমি যে বললে — দেশে দেশে গরিব, মেহনতি মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাহলে তারা পারবে না কেন? পাগল ছেলে, হ্যাঁ আমি বলেছি তো, তারা অর্থাৎ আমরা পারবো। কিন্তু ভাই, গরিব, মেহনতি মানুষগুলো যে জোট বেঁধে নেই। আর মালিকপক্ষকে দেখ, তাঁরা বাজার দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়ালড়ি করলেও, গরিব, মেহনতি মানুষের জোট ভাঙতে ভীষণভাবে একজোট। তাঁদের হাতে মিলিটারি আছে, পুলিশ আছে, তাঁদের অনুগত রাজনৈতিক অনেক দল আছে। কী বিরাট শক্তি! এই শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে গেলে আরও বড় শক্তি চাই। আমরা যেদিন একজোট হব, সেদিন আমাদের বৃহৎ শক্তির কাছে ওঁরা পরাজিত হবে।

মৃত্যুঞ্জয়ের মনটা উশখুশ করছিল। বলেই ফেলল, কিন্তু দাদা, বুঝতে পারছি না — পুলিশ, মিলিটারিতে যারা চাকরি করে, মালিকদের অনুগত রাজনৈতিক দলে যারা আছে, তারাও তো শ্রমজীবী মানুষ। তারা নিজেদের মন্দ ভাগ্যের কথা জেনেও মালিকপক্ষের সাথে হাত মিলিয়ে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে? স্বদেশ মোবাইলে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে দেখল — হাতে একদম সময় নেই। বলল, মৃত্যুঞ্জয়, আজ থাক, আমাকে একটু বেরোতে হবে, তাছাড়া উত্তরটা আমার মুখ থেকে নাইবা শুনলে, একদিন তোমরা তোমাদের বাস্তব জীবন দিয়েই বুঝতে পারবে।

* মাস চার-পাঁচেক পর *

রাজ্যে বিধানসভার ভোট ঘোষণা হয়েছে। স্বদেশ উপরের নেতৃবৃন্দের পরামর্শে নিজের কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছে। মনসুর, হারাধনদের মধ্যে খুশির জোয়ার। মৃত্যুঞ্জয়, সিরাজুল সদর থেকে আসা কমরেডদের সাথে কাজের ফাঁকে ফাঁকে কখনও সকালে, কখনও রাতে দেওয়াল লিখনে সহযোগিতা করছে। রামপ্রসাদ দোকানে বউকে বসিয়ে পোস্টার সাঁটিয়ে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে, বাজারের সামনে পথসভায় সামিলও হচ্ছে সকলে। স্বদেশ ওদেরকে অনুপ্রাণিত করছে, সাথে নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম। ক্লান্তির কথা যেন সবাই ভুলে গেছে। দীন-দুঃখী, শ্রমজীবী মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে বলছে — শাসকের শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন, দমন-পীড়নের কথা, সর্বোপরি কর্মসংস্থান ও সুশাসনের দাবিতে সকলকে সরব হওয়ার কথা।

এরপর এলাকায় সবার উদ্যোগে একদিন একটি বড়সড় মিছিলের আয়োজন করা হল। মনসুর, সিরাজুল, হারাধন, মৃত্যুঞ্জয়, সবাই তাদের ভাই, দাদা, বোন, বউদেরও সামিল করালো মিছিলে। রামপ্রসাদ চায়ের দোকান বন্ধ রেখে বউ, ছেলেমেয়েকে নিয়ে যোগ দিল। ভাদ্রের পড়ন্ত বেলায় প্রায় সহস্র মানুষের প্রাণবন্ত মিছিল এগিয়ে চলল স্লোগানে মুখরিত করে, কখনও শ্রমজীবী মানুষের যন্ত্রণাময় জীবনগাথায় উদ্দীপ্ত হয়ে।

ওদিকে শাসকদলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চালকলের মালিক মনিশঙ্কর মজুমদার। তিনি আজ ফেরিঘাটের অদূরে পিচ-রাস্তার পাশে খোলা মাঠে বিশাল আড়ম্বরে পথসভা করছিলেন। সূর্য তখন দিগন্তরেখায়। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করছিলেন মনিশঙ্কর মজুমদার। সেসময় রাস্তা ধরে মিছিল এগিয়ে আসছে দেখে বক্তৃতা থামিয়ে দিলেন। আর তীক্ষ্ণ নজরে লক্ষ্য করলেন স্বদেশের মিছিলের আদ্যপ্রান্ত।

সেরাতেই অজ্ঞাত একদল দুষ্কৃতি এসে রামপ্রসাদের চায়ের দোকানটা ভেঙে দিয়ে চলে গেল। পরদিন মনসুর, হারাধন, মৃত্যুঞ্জয়, সিরাজুল কাজে গিয়ে জানল — চাকরিটা তাদের আর নেই।

স্বদেশ খবরটা পাওয়ামাত্রই একে একে সবার বাড়িতে ছুটে গেল। অন্যদিন কত আতিথেয়তা পেলেও আজ ভেতরে ঢুকতে পারল না। ওদের বউরা দরজা থেকেই ফিরিয়ে দিল। কেউ বলল, আপনি চইলা যান, আমাদের আর বিপদে ফেলবেন না। কেউ কেউ বলল, আমাদের মুখের আহার এখন কে জোটাবে, বলতে পারেন? আমাদের মান-ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কে ঠেকাবে? একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে ফিরে এল স্বদেশ।

বিকেলে লোকাল কমিটির সম্পাদক কমরেড অনিরুদ্ধ সেন এলেন স্বদেশের বাড়িতে। সাথে নিয়ে এসেছেন আরও জনা তিনেক কমরেডকে। ঘটনা যা ঘটেছে তাতে স্বদেশ হতাশ বা নিরাশ হয়নি। এমন যে ঘটতে পারে, সে আগেই জানত। তবুও কমরেড সেন বললেন, এই শ্রেণির লোকেরা সমাজ গড়ার লড়াইয়ে কখনো অংশ নিতে পারেনি, আজও পারেনা। কেন পারেনা, জানো? দারিদ্র্য ওদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা, যেকারণে সহজেই ওদের মেরুদণ্ড, মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। দিনমজুরি খেটে চালাতে গেলে, আর পরদিন কাজ না জুটলে ক্ষুধার যন্ত্রণায় দুঃসাহসও দুর্বলতায় পরিণত হয়। এই সুযোগই মালিকেরা নেন। কিন্তু আমরা তো লড়াই থেকে পিছপা হতে পারি না। ওই মানুষগুলোকে আবার সাহস জোগাতে হবে। আবার কাছে টানতে হবে। একটা কথা মনে রেখো, সামনে ভোট, মালিক আবার ওদের কাজে বহাল করবেন। তবে ভোট-বৈতরণী পেরিয়ে গেলে পাকাপাকিভাবে তাড়িয়ে দিয়ে কম পারিশ্রমিকে নতুন লোক নেবেন। স্বদেশ, এ তো তুমি জানোই। জানি অনিরুদ্ধদা, মানুষের দারিদ্র্য মালিকপক্ষের কাছে এক বিরাট হাতিয়ার। এই কারণেই দেশে এত খাদ্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও মালিকেরা অভাব জিইয়ে রাখে। বেকারের সংখ্যা যত বাড়বে, ওদের তত মঙ্গল, কম পারিশ্রমিক দিয়ে লাভের অঙ্ক ক্রমশ বাড়িয়ে নেবে। অনিরুদ্ধ সেন স্বদেশের চোখে চোখ রেখে বললেন, তবে মনে হয়, তুমি পুরোটা বোঝনি। তোমার তো প্রশ্ন করা উচিত ছিল যে, শ্রমিকদের তাড়িয়ে দিয়ে মালিক কেন তাঁর নিজের কবর নিজে খুড়বে? স্বদেশ বলে, আপনার কথার মর্মার্থ বোধগম্য হল না। একটু যেন স্ববিরোধী মনে হল।

কমরেড অনিরুদ্ধ বার দুয়েক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ছেড়ে বললেন, স্ববিরোধী মনে হলেও আসলে তা নয়। দেখ, মালিক তাঁর মুনাফার স্বার্থটা দেখবে ঠিকই, আবার তাড়িয়ে দেওয়া শ্রমিকদেরও বাঁচিয়ে রাখবে নিজেদের প্রয়োজনেই। শ্রমিক ছাড়া তাঁদের ব্যবসা, কারখানা চলবে কী করে? তুমি হয়তো বলবে — এই মারাত্মক বেকারত্বের যুগে শ্রমিকের অভাব কোথায়, একথা তো আপনিই বললেন,তাই না? হ্যাঁ, আমি বলেছি। তুমি হয়তো বলবে — শ্রমিক মরল কী বাঁচল, তাতে মালিকের কী আসে যায়? না স্বদেশ, শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। কেননা, কর্মহারা শ্রমিকরা অনাহারে থেকে বসে বসে দিন কাটাবে না। ওরা বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। জোট বাঁধবে। বিপ্লবের পথ সুগম হবে। তাহলে তো মালিকপক্ষেরই বিপদ। কিন্তু মালিক তাঁর মুনাফার স্বার্থে শ্রমিক ছাটাই করবেনই, কম মজুরি দেবেনই, এটাই তাঁর ধর্ম। সামনে কৃত্রিম মেধার যুগ আসছে। কৃত্রিম মেধারাই সব কিছু করে দেবে। কলে-কারখানায় শ্রমিকের আর প্রয়োজন হবে না। অথচ মালিকপক্ষ জানে — তাঁদের কারখানার উৎপাদিত পন্য বিপুল শ্রমিকশ্রেণির মানুষগুলো কিনবে। মালিকপক্ষ এ-ও জানে — তাঁদের পছন্দের দলকে শ্রমিকরাই ভোটে নির্বাচিত করে সরকারে বসাবে। সেই সরকারই তখন ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখার মতো রসদ জোগাবে। ‘দয়ার দান’ সাজিয়ে নিয়ে শ্রমিকের দুয়ারে দুয়ারে হাজির হবে। দিনান্তে অন্তত আধপেট খেয়ে ঐ শ্রমিকরা সব যন্ত্রণা ভুলে যাবে। অথৈ সাগর-বুকে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে ‘না মরে বেঁচে থাকা’ — এটাই হবে ওদের কাছে অনেক বড় কিছু পাওয়া। আর সরকার হবে ওদের পরম বন্ধু। মালিকপক্ষের গায়ে কোনো আঁচড়ই লাগবেনা। বরং তাঁরা যখনই দেখবেন কোনো সরকার জনগণের বিরুদ্ধে চলে গেছে, পুনরায় অন্য কোনো পছন্দের রাজনৈতিক দলকে সহজেই ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় আনবে।

কথাগুলো শুনে স্বদেশ যেন মনমরা হয়ে পড়ল। ভেতরের উদ্ভূত প্রশ্নটা বেরিয়ে এল, তাহলে পুঁজিবাদের এই বেড়াজাল কেটে মানুষের মুক্তি ঘটবে কী করে?

সূর্য তখন দিগন্তরেখার উপরে। কমরেড অনিরুদ্ধ মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই। তিনি স্বদেশের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, দিনমজুর, কিষাণ, কারখানার শ্রমিক সবাই তো মানুষ। ওদেরকে জীবনের সংজ্ঞা বোঝাও, জীবনে কেন এত দুঃখ-ব্যথা, সেই নিগূঢ় সত্যকে চেনাও, অন্তরে অনুভব করাও, দেখবে — না খেতে পাওয়া কঙ্কালসার মানুষগুলো আজ না হলেও কাল মনুষ্যত্বের বলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, নিজেদের ভুল শুধরে নিয়ে অসীম তেজে এগিয়ে আসবে।

কমরেডগন চলে গেল। স্বদেশের মরা মন জীবন্ত হয়ে উঠল। একাই বেরিয়ে পড়ল এলাকায়। এবার আরও দৃঢ় মনোবল নিয়ে ঘুরতে লাগল মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। ‘ভোট চাওয়া’ তার প্রধান উদ্দেশ্য নয়। সে বুঝিয়ে চলেছে — কীসে শোষণ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি ঘটবে।

ভোটের ঠিক দুদিন আগে মনিশঙ্কর মজুমদারের শেষ জনসভায় লোক উপচে পড়েছে। মনসুর, হারাধন, মৃত্যুঞ্জয়, সিরাজুলকে মঞ্চের সামনে দেখা গেল। ওরা ওদের চাকরি ফিরে পেয়েছে। রামপ্রসাদও এসেছে। ওকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে গরিব, দীন-দুঃখীরাও আজ কিছু পাবার আশায় ভিড় জমিয়েছে। সকলে মনিশঙ্করের জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলেছে।

তথাপি স্বদেশ পরাজয়ের মাঝে জয়ের স্বপ্ন দেখছে। সেই জয় ভোটের জয় নয়, শ্রমিকশ্রেণির অধিকারের জয়। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে সেই জয় একদিন আসবেই।

(দ্বিতীয় পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন)
…………………………………………………….

Leave a Comment