| ছোটগল্প | |
| পরলোকের ঠিকানা | – হরবিলাস সরকার |
শ্রাবণে ময়ূরাক্ষী ফুলে-ফেঁপে বয়ে চলছিল। ভাদ্র পড়তেই আবহাওয়াবিদদের আগাম সংকেত-বার্তা অনুযায়ী মহা দুর্যোগের মেঘ জমছিল ময়ূরাক্ষীর দুপারের বিস্তীর্ণ আকাশজুড়ে। এক রাতে আচমকা মেঘভাঙা বৃষ্টিতে বড়ই অসহনীয় হয়ে উঠল ময়ূরাক্ষী। কেঁদে ভাসাতে লাগলো অঝোরে। গ্রামের পর গ্রাম, ফসলের জমি, ঘরবাড়ি ডুবে গেল রাত দুপুরেই।
প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষ সর্বস্ব ফেলে তড়িঘড়ি আশ্রয় নিল খোলা আকাশের নিচে উঁচু কোন জায়গায়, কেউবা দোতলা স্কুল বাড়িতে, কেউ খোলা ছাদে। নিরুপায় পোষ্য জীবগুলোর অধিকাংশেরই করুন সুরে হাঁক-ডাক করতে করতে সলিলসমাধি হল।
ভুবনডাঙার নিতাই কীর্তনীয়া গাঁয়ের সর্বজনীন বিষ্ণু মন্দিরের সেবাইত। তার স্ত্রী ‘চম্পাবতী’ সেবাদাসী। বিষ্ণুদেব রক্ষা করবেন, এই বিশ্বাস ও আশাতেই তারা তাদের পাঁচ বছরের ছেলে ‘গোপাল’কে নিয়ে বাড়ি ছাড়েনি। ঘরের পেছনে আমগাছের ডালে খাটিয়া বেঁধে তার উপরেই আশ্রয় নিয়েছে তিনজন। উপরবৃষ্টির থেকে রেহাই পেতে মাথার উপর টাঙিয়ে নিয়েছে একখণ্ড ত্রিপল। গোপাল ভয়ে শিউরে উঠছে। চম্পাবতী ভয়ার্ত ছেলেকে বুকে আগলে নিয়ে ভগবান বিষ্ণুকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে আকুল হয়ে ডাকছে। সে ডাক যেন আর্তনাদ হয়ে দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। নিতাইও ছেলেকে অভয় দেয়। স্ত্রীর আর্তনাদ সইতে না পেরে তাকেও সাহস যোগায়। ভেতরে ভেতরে নিতাই নিজেও অসহায় বোধ করে বিষ্ণুদেবকে স্মরণ করে চলেছে অবিরাম।
এমনিকরেই রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। পূর্ব দিকে ভোরের ক্ষীণ আলোর রেখা ফুটে উঠেছে। নিতাই বিষ্ণুদেবকে প্রণাম করে অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে সূর্যোদয়ের দিকে।
এমনসময় মহা দুর্যোগ মাথায় নিয়ে আবছা অন্ধকারে পরদুঃখে কাতর একজন মানুষ নৌকা নিয়ে প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে এগিয়ে চলেছে নিতাইয়ের পরিবারের খোঁজে। রাতভর জলে-বৃষ্টিতে ভিজে বুকে ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলেছে। তবুও কোনো কিছুই আজ তাকে দমাতে পারবেনা। এমনই তার অদম্য মনোবল। কাছাকাছি পৌঁছাতেই তার উৎকণ্ঠা ভরা চোখদুটো ঠাওর করে ফেলল – ঐ তো নিতাইদার পরিবার। আরও কাছে যেতেই বেরিয়ে এল কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর — নিতাই, চম্পাবৌদি, ছেলেকে নিয়ে চাপো আমার নৌকায়। হাইস্কুলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তোমাদের পাশের বাড়ির গনেশ বলাবলি করছিল – নিতাইদাকে কতবার ডাকলাম, কত বোঝালাম, তবুও বাড়ি ছাড়লনা। ভাগ্যিস কথাটা শুনতে পেয়েছিলাম।
নিতাই মুখ উঁচিয়ে দেখল – মানুষটা আর কেউ নয়, ফাল্গুনী। বুঝি এসেছে আমাদের উদ্ধার করতে। কী ভাবছো, নিতাইদা? ওঠো তাড়াতাড়ি। নিতাই মুখের উপর ‘না’ বলে দিল। চম্পাবতীও এই ঘোর বিপদের মধ্যে বলে বসল, ঠাকুরপো, তুমি গাঁয়ের লোক হতে পারো, ভগবান মানোনা। গাঁয়ের সব লোক তোমার বিরুদ্ধে। তোমার নৌকায় আমরা চাপবো না। তাছাড়া বাড়ি আমরা ছাড়বো না। আমি সতী নারী। আমার স্বামী দিনরাত বিষ্ণুর চরণে পড়ে থাকে। আমার ছেলেও নিষ্পাপ। বিষ্ণুদেব ঠিকই আমাদের রক্ষা করবেন। বৌদি, এখন কি আর তর্ক, ঝগড়া করার সময়? আর ঝগড়া যদি করতেই হয়, পরে করো। আমি খারাপ, মন্দ, ভগবানকে বিশ্বাস না করা মানুষ, যা-ই হই না কেন, অন্ততঃ এই বিপদের সময় আমার নৌকায় ওঠো। এতে তোমাদের গায়ে পাপ লাগবে না। গাঁয়ের মানুষও আশাকরি খারাপ চোখে দেখবে না। রাত দুপুর থেকে একশোর উপর মানুষকে নৌকায় চাপালাম, অনেকে নাক ছিটকিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেউ তো এভাবে বলেনি। নিতাই বলে উঠল, কেউ না বলুক, আমরা বলছি। ভগবানের ভক্ত হয়ে তাঁর শক্তিকে ছোট করতে চাই না। ভক্তের ভগবান তাঁর ভক্তকে বাঁচাবেনই। তুমি ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মেও মহা পাপী, নিকৃষ্ট। তোমার মতো অধার্মিকের সাহায্য আমরা চাই না। তুমি স্কুল-মাস্টার হতে পারো, পুঁথিগত জ্ঞানের বড়াই করতে পারো। এই আমি গলার তুলসীর মালা ছুঁয়ে বলছি, ভগবানকে না জানলে, না মানলে সব শিক্ষাই বৃথা। বিপ্লবের বাণী যতই আওরাও, লাভ হবে না। মানুষকে মুক্তি দিতে পারেন একমাত্র ভগবানই। ফাল্গুনী এতক্ষণে কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলে ফেলল, সে মুক্তি ইহলোকে ঘটবে না, ঘটবে পরলোকে। আর সেই পরলোকের ঠিকানা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথায় আছে, তুমিও জেনেছো কিনা জানিনা, তবে আমার জানা নেই। চম্পাবতী স্বামীকে থামিয়ে হাতজোড় করে অশ্রুসিক্ত চোখে ঘৃণা ও রাগের বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিল, ছি! এসব কুকথা তুমি বলতে পারলে ফাল্গুনী? আমাদের মহাপাপের ভাগীদার করে দিলে? ভগবান তোমার বিচার করবেন। হে বিষ্ণু! হে ভগবান! তুমি আমাদের পাপ মুক্ত কর। জগতের রক্ষাকর্তা তুমিই। মানুষ কেউ না। …..।
ফাল্গুনী নৌকা নিয়ে ফিরে এল। বেলা এক প্রহর থেকে ভারী, তারপর অতি ভারী বৃষ্টি শুরু হল। খবরে জানা গেল – বাঁধের কর্তৃপক্ষ বাঁধকে বাঁচাতে আরও বিপুল পরিমাণ জল ছেড়ে দিয়েছে। ফাল্গুনীর মন কিছুতেই সইছে না। সরকারি ত্রাণ সামগ্রীও পর্যাপ্ত এসে পৌঁছায়নি। এই মহা দুর্যোগের মধ্যে এটুকুও সবার কাছে পৌঁছাবে কিনা, তারও নিশ্চয়তা নেই। কে পৌঁছে দেবে নিতাইদাকে খাবার? ছোট্ট গোপালটা বুঝি এতক্ষণে ওর মায়ের কাছে খাবার চাইছে! …… !
জলস্তর ক্রমে বাড়তে থাকল। গাছপালা, কাঁচা বাড়িঘরের চালা, বেড়া ভেসে আসতে লাগল। অনেক পাকাবাড়িও ধসে গেল।
গোপালের কান্না যেন শুনতে পাচ্ছে ফাল্গুনী। বুঝি বলছে, মা, আমাকে ছেড়ো না, ছেড়ো না, মা। ওর মা-ও বুঝি বলছে, আমার আদরের সোনা, কাঁদিস নে। প্রাণ থাকতে আমি তোকে ছাড়বো না।
মন অশান্ত হয়ে উঠল ফাল্গুনীর। চরম উৎকণ্ঠার মাঝেও ঠান্ডা মাথায় ভাবতে লাগল, কেমন করে অসহায় মানুষগুলোকে বাঁচানো যায়। মন্দির কমিটির সভাপতি ‘গোবিন্দ মজুমদারে’র কথা মাথায় এসে গেল। ওঁনাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে নিতাই আর ‘না’ বলতে পারবে না। এই আশা নিয়েই নৌকা ছোটালো গোবিন্দদার বাড়ির দিকে। দূর থেকে দেখল, গোবিন্দদার পরিবার তাঁর দোতলা বাড়ির ছাদে তাবুর চালার নিচে আশ্রয় নিয়েছে। আর গোবিন্দদা ছাতা মাথায় রুদ্রাক্ষের মালা জপতে জপতে বিধ্বংসী বন্যার তাণ্ডব আর জলস্তর লক্ষ্য করছেন। নৌকা ভিড়িয়ে ফাল্গুনী উচ্চস্বরে হাঁক দিল, গোবিন্দদা, শিগগির চলুন, নিতাইদার পরিবারকে বাঁচাতে হবে। বাড়িতেই আছে, আমগাছের ডাল আকড়ে ধরে। দেরি হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। গোবিন্দদা প্রথমত কিছুটা চমকে উঠেছিলেন। তারপর লক্ষ্যবস্তু থেকে নজর ঘুরিয়ে তীর্যক নজরে তাকালেন উদ্ধারকারী মাঝির দিকে। আর নিমেষে মালা জপা বন্ধ করে, সেই হাতে অ্যালুমিনিয়ামের রেলিংটা শক্ত করে ধরে নিয়ে বললেন, পাগলের প্রলাপ বকছো কেন? তোমার মতো অধার্মিক বাঁচাবে নিতাইয়ের পরিবারকে? নিতাই বিষ্ণুর উপাসক। রাখে হরি মারে কে? গোবিন্দদার স্ত্রী শাড়ির আঁচলে মাথা ঢেকে তাবুর তলা থেকে বেরিয়ে এসে মুখ বাড়িয়ে বললেন, শোনো ফাল্গুনী, দেখছো না – কী ভয়ানক অবস্থা! নিতাই বিপদে পড়েছে বলে এই মানুষটাকেও তুমি বিপদে ফেলতে চাইছো?
ফাল্গুনী আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ফের নৌকা ছোটালো নিতাইয়ের বাড়ির দিকে। গিয়ে দেখল- যে আমগাছটায় নিতাইয়ের পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল, সেটি আর নেই। ভেসে গেছে। স্রোতের অনুকূলে তার নৌকা ছুটল এবার তীব্র গতিতে। বেশ কিছু দূরে গিয়ে পাওয়া গেল নিতাই আর তার স্ত্রীকে। কিন্তু গোপাল কোথায়?
কয়েক ঘণ্টা পরে গোপালের নিথর দেহ পাওয়া গেল ‘পলতার বিলে’ জেলেদের পাতা জালে। মৃতদেহ আনা হল ভুবনডাঙা হাইস্কুলের ছাদে।
কয়েকদিন পর বাণের জল নেমে গেল। গ্রামের পর গ্রাম যেন শ্মশানে পরিণত হয়েছে। ভুবনডাঙার বিষ্ণু মন্দিরটা দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন নিয়ে। নিতাই, চম্পাবতী হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরল। ফিরল না তাদের আদরের গোপাল।
গোবিন্দদা আজ এলেন। নিতাই, চম্পাবতীর মাথায় আশীর্বাদের হাত রেখে সুললিত ভাষায় বললেন, তোমাদের গোপাল পরলোকে স্বয়ং বিষ্ণুদেবের কোলে ঠাঁই পেয়েছে। ও ভালোই আছে।
………………………………………………………..