সর্ব ঘটের বিল্বপত্র | বাংলা ছোটগল্প | হরবিলাস সরকার

(ছোটগল্প)
সর্ব ঘটের বিল্বপত্র – হরবিলাস সরকার

sarbo-ghoter-bilwapatra

শ্রাবণের আকাশ মেঘে ঢাকা। অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। কখনও রিমঝিম, কখনও মুষলধারে। সকাল হয়েছে অনেক্ষণ আগেই। তবু যেন চারদিকে আবছা অন্ধকার। কাল রাতে ফেরিঘাটে পালা পড়েছিল বাদলের। সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে নৌকা চালিয়ে বাড়ি ফিরল যখন, তখনও ছোট্ট কমল ঘুমোচ্ছে। বাদল ভেজা পোশাক পাল্টে, শরীরটা মুছে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

কুসুম আজ শহরে বাবুদের বাসায় কাজে যেতে পারেনি। গরম গরম রুটি করছিল। ভেবেছিল, কমলের বাবা বাড়ি ফিরলে তিনজনে মিলে লিকার চা দিয়ে রুটি খাবে। কিন্তু মানুষটা এসেই শুয়ে পড়ল! কেন? কুসুম একরাশ আতঙ্ক নিয়ে কাছে গিয়ে দেখল — বাদলের গা-টা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। দেরি না করে শাড়ির আঁচলে মাথা ঢেকে দৌড়ে গেল গ্রামের ভুবন ডাক্তারের কাছে। জ্বরের ট্যাবলেট নিয়ে এসে বাদলকে খাইয়ে দিল।

sarbo-ghoter-bilwapatra

ঘন্টাখানেক পর জ্বর অনেকটাই কমে গেল। বাদল উঠে বসল। কমলেরও ঘুম ভেঙেছে একটু আগে। তিনজনে মিলে রুটি খেল গরম চা দিয়ে। আজ সবারই ছুটি। কমল বই নিয়ে পড়তে বসে গেল। ছেলের আচরণে বাদলের ভেতরে খুশির হাওয়া বইছে। কুসুমও হাসিমুখে বলল, কমলের বাবা, ছেলে আমার দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে, এখনই কত বুদ্ধি! ওকে আমি মানুষ করে তুলবোই। সেজন্যই তো এত খাটছি গো। বাদল ভাবছে, কুসুম, এ তো আমারও মনের কথা। পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করল, তোমার একাউন্টে অন্নপূর্ণার টাকা ঢুকেছে? হাসি মুখখানা মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। না গো, কেন ঢুকল না — তুমি কি জানো কিছু? না, তবে নৌকায় অনেকে বলাবলি করছিল, তিনটে ঘরসহ পাকা বাড়ি থাকলে সে অন্নপূর্ণার টাকা পাবে না।

কুসুমের কাজল কালো চোখ দুটো বিষাদের ছোঁয়ায় স্থির হয়ে গেল। তার সব আশায় নিমেষে কে যেন জল ঢেলে দিল। বাদলও দুঃখ করে বলতে লাগল, আগের সরকার আমাকে ঘর দেয়নি, ত্রিশ হাজার টাকা ডোনেশন দিতে পারিনি বলে। সেই রাগেই তো জেদ ধরেছিলাম। দুটো বছর আধপেট খেয়ে, অনেক কষ্ট করে, ধার-দেনা করে বাড়িটা বানিয়েছি। তাও তো বালি-সিমেন্ট লেপা বাকি। জানালায় কাঠ লাগাতে পারিনি। সরকার বদল হয়ে নতুন সরকার এল। এ সরকারও আমাকে পাকা বাড়ি দেবেনা। এক নেতা অবাক হয়ে বলেছেন, বাদল, তুমি পাকা বাড়ি বানিয়ে ফেলেছো? অনেক টাকাই তো কামিয়েছো দেখছি। তবে আবার সরকারের কাছে বাড়ি চাইছো কেন? এমন চোখে যাঁরা গরিবকে দেখেন, তাঁরা গরিবের দুঃখ-ব্যথা বুঝবেন কী করে? বুঝলেন না বলেই প্রতিশ্রুতি দিয়েও অন্নপূর্ণার টাকাটা তোমাকে দিলেন না।…..। কুসুম চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, মহান গান্ধীজির ছবিতে বছর বছর মালা পরালাম, মা-মাটি-মানুষের দল করলাম, মিছিলে হাঁটলাম, জয় বাংলা বলে চিৎকার করলাম, পেলাম শুধুই বঞ্চনা। ভাবলাম, নতুন দল ক্ষমতায় এলে তাঁরা আমাদের দেখবে। তাঁদের ডাকে সাড়াও দিলাম। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে প্রচার করলাম। দিনের পর দিন মিছিল করলাম। জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস ভরিয়ে দিলাম। সব বৃথা গেল। গরিব মানুষ আমরা। এইটুকু আশা নিয়েই তো বুক বাঁধি। তিন হাজার টাকা পেলে বড়ই উপকার হত।

ছোট্ট কমল এসব বোঝেনা। মায়ের দুঃখ দেখে সে-ও বই বন্ধ করে দিয়ে চোখ মুছতে লাগল। প্রিয়জনের চোখের জল বাদলকেও অশ্রুসিক্ত করে তুলল। তবুও শত দুঃখকে বুকে পাথর চাপা দিয়ে কুসুমকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। এরপর কুসুমও নিজেকে শক্ত করে আদরের ছোট্ট সোনাকে হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিল। এদিকে ফেলে আসা দুঃসহ অতীত বহুদিন পর বাদলের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। কত কথা মনে পড়ছে ! মনের সেই কথাগুলো কুসুমকে বলবার জন্য সে উদগ্রীব হয়ে উঠল।

জানো কুসুম, আমার জীবনের এক সময়ের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা আজ তোমাকে বলছি। গল্পের মতো মনে হবে। তখন সবে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছি। পড়াশোনায় ইতি টেনে দিয়ে কাজের খোঁজ করতে লাগলাম। সংসারে আমার মা, ছোট বোন আর আমি। মা মুড়ি ভেজে বিক্রি করে। ও-ই দিয়েই সংসার চলে। কিন্তু বয়সের কারণে সেভাবে আর পেরে উঠছে না। জিনিসপত্রের দামও হুহু করে বাড়ছে। দেখতে দেখতে বোনও বড় হয়ে উঠেছে। লেখাপড়া করছে। মায়ের কাজেও সাহায্য করে। কিন্তু মাথার উপরে জ্যৈষ্ঠের অসহ্য গরম আর আখার তাপে মা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল। আমার হাত ধরে বলল, বাদল, এবার তুই সংসারের হাল ধর্। আর একটা কথা বলছি, শোন্, পাড়ার পরিবেশ ভালো না। আমার কাকলি খুব ভালো মেয়ে। বিয়ের বয়স হয়নি। তবু ওকে বিয়ে দিতে হবে, বাবা।

sarbo-ghoter-bilwapatra

মায়ের কথাগুলো আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলল। আমাদের ফেরিঘাটের মালিকের হাতে-পায়ে ধরে নৌকা চালানোর একটা কাজ পেলাম। ক’দিন ‘দীনেশ মাঝি’র সাথে থেকে নৌকা চালানোটা শিখেও নিলাম। সেই থেকেই আমারও নতুন নামকরণ হয়ে গেল ‘বাদল মাঝি’।

আষাঢ়ের শেষে এক বর্ষামূখর রাতে নৌকাতেই আলাপ হল সুব্রত মৈত্র নামে এক ভদ্রলোকের সাথে। সদরে থাকেন। উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁর আরও বড় পরিচয় — তিনি ক্ষমতাসীন দলের জেলা সম্পাদক। অল্প সময়ে তাঁর কিছু কথা আমার অত্যন্ত ভালো লাগল। মনে মনে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম। অবকাশ পেলেই পার্টি অফিসে চলে যেতাম। আমাদের জীবনে কেন এত দুঃখ, দারিদ্র, সেসব জানতে পারলাম। জানলাম, এসবের থেকে মুক্তি লাভের উপায় হল — অচল, বন্ধ্যা সমাজকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে হবে। শ্রমিক শ্রেণির সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি অনুপ্রাণিত হলাম। মার্কসবাদ-লেলিনবাদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হলাম। দেওয়াল লেখা, পোস্টার সাটানো, কোনো কিছুই বাদ থাকল না। জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালো ‘বিপ্লব’। শত কষ্টের মধ্যেও নিষ্ঠার সাথে সব করতাম। ভালই লাগত।

কিন্তু ইতিমধ্যে বাড়ির আনাচে-কানাচে বাজে ছেলেদের আড্ডা, উৎপাত শুরু হয়েছে জোর কদমে। কাকলি ঘর থেকে বেরোতে পারেনা। ওর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। নিরুপায় হয়ে ষোলো বছর বয়সেই ওকে পাত্রস্থ করলাম।

কীগো, কুসুম, এত কথা বলে গেলাম, তুমি তো কিছুই বলছো না। না, ভাবছিলাম, তোমার দুঃখভরা জীবনের ছবিটা যেন আমারই জীবনের প্রতিচ্ছবি। মায়ের মৃত্যুর পর সংসারের হাল ছিল আমারই হাতে। ছোট বোনটাকে রক্ষা করতে পারিনি। ওর দিকে ওৎ পেতে বসেছিল শকুনের দল। হয়তো সব অভাগারই জীবনের পাতায় পাতায় এমন করে লেখা আছে কোনো করুন কাহিনি। মানুষ সুখের কথা মুগ্ধ হয়ে শোনে। আমি দুঃখের কথাগুলোই মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। বলো, শুনতে আমার বড়ই ভালো লাগছে।

sarbo-ghoter-bilwapatra

হ্যাঁ কুসুম, আমারও বলতে ভালো লাগছে। এরপর হঠাৎ এক সুখবর বয়ে নিয়ে এলেন পোস্ট অফিসের পিওনবাবু। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে আসা একটা চিঠি পেলাম হাতে। বুঝলাম, প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরির পরীক্ষায় বসার একটা সুযোগ এসেছে।

পরীক্ষা দিলাম। মেধা তালিকায় নামও উঠল। কিন্তু আমার নামে নিয়োগপত্র এলো না। খোঁজ নিয়ে দেখলাম, মেধা তালিকায় আমার নাম কেটে সুব্রতবাবুর সেজো ভাইয়ের নাম ঢোকানো হয়েছে। আরও জানতে পারলাম, পরীক্ষা না দিয়েও তাঁর ছোট বোন নিয়োগপত্র পেয়েছে। এভাবেই নিজের চোখে দেখলাম, নেতাদের স্বজনপোষণ আর আখের গুছিয়ে নেবার কী ভীষণ উদগ্র বাসনা!

সুব্রতদা আমাকে জেলা অফিসে ডেকে বোঝালেন, তুই তো বিপ্লব করবি, চাকরি করবি কেন? চোখের সামনে বিপ্লবের লাল রঙটা যেন ফিকে হয়ে গেল। বিষণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম। বাইরে পার্টি অফিস লক্ষ্য করে অনেকে বলাবলি করছিলেন — এঁরা মুখোশধারী, ভণ্ড, মার্কসবাদকে কলঙ্কিত করছেন। আমি দল ছেড়ে দিলাম।

বছরখানেকের মধ্যে ভোটে সুব্রতবাবুরা হেরে গেলেন। ক্ষমতায় এল মা-মাটি-মানুষের দল। অনেক প্রত্যাশায় নতুন করে বুক বাঁধলাম। তুমিও এলে হতভাগার জীবন সঙ্গিনী হয়ে। এর পরের কাহিনী তোমার সব জানা।

কুসুম অশ্রুপ্লাবিত চোখে বলল, সরকার যায়, সরকার আসে। গরিব যে তিমিরে সেই তিমিরেই থাকে। তাদের দিনের আলো ফোটে না। বাদলের দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ে। বলে, প্রদীপের নিচের অন্ধকার কখনো দূর হয় না। আমরা চিরকাল সেই অন্ধকারেই ডুবে মরি। কেউ ঘর বাঁধি চোরা বালির চড়ে, কেউবা ভাঙনের তীরে। কত জ্ঞানী-গুণীজন এসে বিদ্যাসাগর, নেতাজির কথা বলেন। প্রকৃত মার্কসবাদ, সাম্যবাদের কথা বলেন। তবে অবিশ্বাসের যন্ত্রণাভরা বুকে এখন আর কোনো নীতি-আদর্শ দাগ কাটেনা। মরুবুকে মরীচিকা কখন যে মিথ্যা হয়ে মিলিয়ে যায়, কে জানে? দুমুঠো খাবার নয়তো দয়ার দান কুড়োতে, যেঁ যখন ডাকে, তাঁর পিছে ছুটি। মিছিলে হাঁটতে বললে হাঁটি। জনসভাস্থল ভরিয়ে দিই। আমরা সর্ব ঘটের বিল্বপত্র। পুজো হয়ে গেলে যেঁ যাঁর মতো বিসর্জন দিয়ে দেন। ভেসে যাই অকুল পাথারে।

কুসুম গভীর যন্ত্রণায় বলে উঠল, যুগে যুগে এ-ই তো অত্যাচারীত, নিপীড়িত মানুষের ইতিহাস। এদেশে রামায়ণের যুগ থেকে কুরুক্ষেত্রের যুগ, তারপর আজ পর্যন্ত, সে ইতিহাস বদলায়নি। বংশপরম্পরায় আজ আমরা পুঁজির জোয়ালে বাঁধা অসহায়, নিপীড়িত শ্রমিক। কে দেখাবে আমাদের চির দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ? অন্ধকার সরিয়ে কবে উদয় হবে দিনের সূর্য?

…………………………………………………….