ক্ষয়ী সমাজ | বাংলা অণুগল্প | হরবিলাস সরকার

অণুগল্প (কল্পনাপ্রসূত)
ক্ষয়ী সমাজ – হরবিলাস সরকার

স্রষ্টার কথাঃ রূঢ় বাস্তব চুপিসারে এসে ধরা দিল!

জ্ঞানেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে একটা টোটো এসে দাঁড়াল। যাত্রী একজন পরীক্ষার্থী। ফটক খুলতে এখনও আধ ঘন্টা দেরি। পরীক্ষার্থী টোটো থেকে নেমে অগত্যা একটি বন্ধ দোকানের সেটের তলায় এসে বসল। সে শেষবারের মতো বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগল।

হঠাৎ সেখানে এক হৃষ্টপুষ্ট যুবক উদয় হয়ে পরীক্ষার্থীকে ধমকাতে-চমকাতে লাগল, কে তুই? এটা তোর পড়ার জায়গা?

পরীক্ষার্থী নম্রভাবে বোঝানোর চেষ্টা করল, আমি সুশোভন সেন, ভিন জেলা থেকে এসেছি। WBCS পরীক্ষার্থী। এটা তোমার দোকান, দাদা?

তবে কি তোর বাপের দোকান? এই চত্বরের সবকিছুই আমার। এখানে বসতে গেলে ১০০ টাকা লাগবে। টাকাটা ঝাড়। ঝাড় তাড়াতাড়ি, নয়তো এমন থাবড়া মারবো না, ………।

না না, মেরো না, ১০০ টাকা দিচ্ছি।

ক্ষয়ী সমাজ | বাংলা অণুগল্প |

টাকাটা পকেট থেকে বের করে যুবকের হাতে দিয়ে সুশোভন বিনীত অনুরোধ করল, ব’সো না দাদা! তোমার সাথে একটু গল্প করি। তোমাকে খুব ভালো লেগেছে আমার।

যুবক বসল। সিগারেট ধরিয়ে লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে একটু নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, কী একটা পরীক্ষা দিচ্ছ, বললে? WBCS- এর মেন পরীক্ষা। বড় চাকরি বুঝি? বলতে পারো। পাস করলে কোন্ পদে চাকরি হবে? বিডিও, এসডিও বা তার থেকেও বড় পদে। কত মাইনে পাবে? শুরুতে ৬০-৭০ হাজার, ধরে নাও।

সুশোভনও যুবকের কাছে এবার জানতে চাইল, দাদা, তোমার পেশাটা কী? আমার কোন পেশা নেই, নেশা আছে। বুঝলাম না। যুবক হো হো করে হেসে উঠল। বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে বলল, এই জ্ঞান নিয়ে বিডিও, এসডিও হবে? আমি ভাই হাই স্কুলের দরজা অবধিও পৌঁছাইনি। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয় পার করেছ। তা এই সাধারণ কথার মানেটা বুঝতে পারলে না? না, যদি একটু পরিষ্কার করে বলো।

যুবক আবারও সিগারেটের লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, নেশা হল টাকা কামানো। দিনে আমি হাজার তিনেক টাকা কামাই। আগামী দিনে এটা বহুগুণ বাড়বে। কীভাবে? ছ’মাস পরেই এম.এল.এ’র ভোট। রুলিং পার্টির নেতারা আমাকে টিকিট দেবে। পাক্কা কথা। তাহলে তো Good News দাদা। যুবক উৎফুল্ল চিত্তে বুক চাপড়ে বলল, এই জ্ঞানেশ্বরী কেন্দ্রে একজনই জিতবে, সে হল এই বিক্রম বিদ্যাধরী।

সুশোভন ভ্রু কুচকে বিস্ময়ের হাসি হেসে বলল, বিক্রমদা, তোমার ভেতরে তো এক মহান মানবতা লুকিয়ে আছে! ক’জন দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে, বলোতো? তা যা বলেছ ভাই। দেশ-সেবার মতো বড় চাকরি আর ক’টা আছে? কোনো ডিগ্রি লাগেনা। মাসে দেড় লক্ষ টাকা মাইনে।

এমনসময় বিদ্যালয়ের ফটক খুলে গেল। ‘তোমার মঙ্গল হোক’ – এই বলে বিক্রমদাকে বিদায় জানিয়ে সুশোভন ভিতরে ঢুকল।

বছরখানেক পর, জ্ঞানেশ্বরীর বিডিও অফিস নতুন রং, ফুল-মালায় সেজে উঠেছে। শীঘ্রই নবনির্বাচিত বিধায়ক আসছেন পরিদর্শনে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে, নতুন বিডিও যোগদান করবেন একই দিনে।

সময়ের ঘড়িটা যেন দ্রুত চলতে থাকল। ঘনিয়ে এল সেই নির্ধারিত দিন। দুজন বিশিষ্ট নতুন মানুষের পদার্পণ ঘটল জ্ঞানেশ্বরী বিডিও অফিস সংলগ্ন অনুষ্ঠান মঞ্চে। ‘স্বাগতম’ ধ্বনিতে ভরে উঠল চারদিকের আকাশ-বাতাস। আলোর ফলক ঝলমলিয়ে উঠল। বাজি ফাটল। পায়রা উড়ল। বেলুন উড়ল। সংগীত, নৃত্য পরিবেশিত হল। এভাবে সমাপ্ত হল প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান।

এরপর দ্বিতীয় পর্ব। সঞ্চালকের ঘোষনা অনুসারে বক্তব্য রাখতে উঠলেন নতুন বিডিও সুশোভন সেন। তিনি নবনির্বাচিত বিধায়ককে শ্রদ্ধা, অভিনন্দন ও নমস্কার জানিয়ে বললেন, আপনার পায়ের ধুলোয় ধন্য হয়ে উঠুক জ্ঞানেশ্বরীর জনজীবন। এই শুভলগ্নে আমিও নিজেকে ধন্য মনে করছি। আপনার আদেশ শীরোধার্য করে আমি আমার কর্তব্যে অবিচল থাকব। …….।

এরপর বক্তৃতা করতে উঠলেন অনুষ্ঠানের মূল বক্তা নবনির্বাচিত বিধায়ক বিক্রম বিদ্যাধরী মহাশয়। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা মানুষটি মাইক্রোফোনের সামনে আসতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুরু করলেন বক্তৃতা। সম্মানীয় বিডিও সাহেব এবং মান্যগণ্য কর্মচারীগণ, আমি সরকারের পক্ষ থেকে একটা বারোতা দিতে আপনাদের কাছে এসেছি। আর তা হল — আপনাদের সহযোগিতা নিয়ে জলের মতো স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তুলব। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়াই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে আমিও মরণঝাঁপ দেব। …..।

বক্তৃতা শুনে কর্মচারীগণ মুচকি হাসছেন। বিডিও ভাবছেন, লোকটার মধ্যে শিক্ষার লেশমাত্রও নেই। কীসব অদ্ভুত শব্দচয়ন! ‘বার্তা’কে ‘বারোতা’, ‘মরণপণ লড়াই করব’ না বলে ‘মরণঝাঁপ দেব’, এসবে তো সত্যিই হাসির খোরাক জোগাচ্ছেন।

বিধায়কের মুখ থেকে এবার ইংরেজি ভাষ্য বেরিয়ে এল। “ইট ইজ মাই প্রমাইস। ইট ইজ মাই ইডিয়টলজি।” ……।

বিডিও আবারও ভাবছেন, এই রে, কী সাংঘাতিক ইংরেজি ! ‘প্রমিস’কে ‘প্রমাইস’, ‘ইডিয়লজি’কে ‘ইডিয়টলজি’, ছি! বিদ্যাধরী মশায়, ভেতর যে শূন্য, সেই পরিচয়টাই দিয়ে দিচ্ছেন।

ক্ষয়ী সমাজ | বাংলা অণুগল্প |

যাইহোক, বক্তৃতা শেষ হল। অনুষ্ঠান শেষে বিডিও’র কক্ষে দুজনের একান্ত আলাপচারিতায় বিডিও সাহেব কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, জানেন, আমার বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন ছিল। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। ইচ্ছে থাকলেও আর এগোতে পারিনি। অবশেষে WBCS-টাই বেছে নিলাম। বিধায়ক মুহূর্তে কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলে উঠলেন, আপনাকে বড্ড চেনা চেনা লাগছে, আগে কোথায় যেন দেখেছি। বিডিও সাহেব বললেন, এতক্ষণ আমারও ভেতরে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। আপনার এই শ্বেত-শুভ্র পরিধান আমার চেনার মাঝে অচেনার বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি — আপনিই সেই দাদা, যার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল জ্ঞানেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে। কী, ঠিক তো? হ্যাঁ, আমারও মনে পড়ছে — আপনিই সেই ‘ডাব্লুবিসিএস পরীক্ষার্থী’ সুশোভন সেন। তাহলে সত্যিই বিডিও’র চাকরিটা পেয়ে গেলেন! আপনিও তো বিধায়ক হয়ে গেলেন। এখন আপনার হুকুমের দাস আমি। তাহলে কাজ শুরু করে দিন – এই বলেই বিধায়ক উঠে তড়িঘড়ি হাঁটা ধরলেন। বিডিও সাহেবও পেছন পেছন হেঁটে বিধায়ক মহাশয়কে এগিয়ে দিলেন তাঁর কনভয় পর্যন্ত। রাজকীয় মর্যাদায় কনভয় যাত্রা শুরু করল। বিষণ্ন মনে বিডিও সাহেব তাকিয়ে রইলেন। দেখছিলেন সমাজটাকে। তাঁর অন্তর্যামী বলে উঠল, এ-ই আমাদের সমাজ। ……..।

…………………………………………………………