মহা বিপ্লবের সৈনিক

(কবিতা)
মহা বিপ্লবের সৈনিক
হরবিলাস সরকার

চাইনা স্বর্গরাজ্য,
চাইনা দেবতা হতে,
দানব হয়েও বাঁচতে চাই না।

সমুদ্রমন্থনে উঠেছিল সুধা,
সেই সুধা পান করে
অমর হয়েছিল দেবতা আর দানবেরা,
স্বর্গসুখ তাঁদের জন্যই।

চেয়ে দেখো ঐ —
মদমত্ততায়, বিলাসিতায়, বিনোদনে
জীবন কাটে যাঁদের,
মেহনতি মানুষের মেহনত লুটে
নির্মিত বৈভবের অট্টালিকায়
সুখনিদ্রা হয় যাঁদের,
অপ্সরা, দৈবকিদের উদ্দাম শরীর দোলনে খুশির বন্যা বহে জীবনে যাঁদের,
দেবতা আর দানবের আশীর্বাদে ধন্য তাঁরা, স্বর্গসুখ তাঁদের জন্যই।

আমরা ভগবানের ভক্ত নই,
কৈকেয়ী, মন্থরা, শকুনিও নই,
ঋষি দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র নই,
নই বাল্মীকি, বেদব্যাস,
দেবতা আর দানবের যুদ্ধের কাহিনি লেখা আমাদের ব্রত নয়।

দুঃখের এই ভুবন পারে
আজও অসহায় কত সীতামা কাঁদে!
বস্ত্রহরণ হয় দ্রৌপদীদের,
আমরা তাদের কথাই লিখি অশ্রুজলে।

অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের সাথে হাত মিলিয়ে স্বদেশী শাসকের হাতে এসেছিল
মধ্যরাতের স্বাধীনতা,
মাটির মানুষের স্বাধীনতা আসেনি,
তাই এত আর্তনাদ, হাহাকার
পৃথিবীর আকাশে বাতাসে।
মানুষের স্বাধীনতার মিথ্যা জয়গান করে,
অলীক দেবতার মিথ্যা মন্ত্র আওড়ে,
দানবের প্রলয় নাচন নেচে
উল্লসিত, গর্বিত যারা,
আমরা নই তাঁদেরও দলে।

মানুষের পৃথিবীতে
আমরা নিপীড়িত, হতভাগ্য সাধারণ মানুষ, দুমুঠো খাবার জোটাতে কঠোর পরিশ্রম করি,
খরতপ্ত রোদে পুড়ে, ঝড়-জলে ভিজে
মাঠে মাঠে ফসল ফলাই,
ধনীর অট্টালিকা, রাজপ্রাসাদ গড়ি,
তবু আমরাই আধপেট খেয়ে, কখনও অনাহারে
খোলা আকাশের নিচে জীবন কাটাই,
অভিশপ্ত ক্ষুধার রাজ্যে ক্ষয়ে ক্ষয়ে
মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে জীর্ণ-কঙ্কাল হাতে
যমরাজের সাথে পাঞ্জা লড়ি।
এমনিকরেই আমরা বেঁচে থাকি,
পৃথিবীকে রূপ-রস-সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিই, প্রতিদিন স্বপ্ন দেখি।

এক ফোটা ওষুধ না পেয়ে
চোখের সামনে আমাদের দুধের শিশুরা
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে,
আমরা বুক চাপড়ে কেঁদে উঠি,
তবুও আমরা বেঁচে থাকি।

আমরা প্রতিদিন শোষণ-যাঁতাকলে পিষে মরি, মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করি,
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মৃত্যুপুরীর যাঁতাকলটা আমাদেরকেই চালাতে হয়।

আমরা মহাকাশে পাড়ি দিই,
কত অজানাকে জানি,
খনিগর্ভ, সমুদ্রের তলদেশ থেকে
মনি-মানিক্য, মুক্তা কুড়িয়ে আনি,
মহাবিশ্বের যত জ্ঞানভাণ্ডার
আমরাই সমৃদ্ধ করি।
আমরা শিল্পী, গল্প, কবিতা লিখি,
উপন্যাস, সংগীত রচনা করি,
আমরা বিশ্বকর্মা, নূতনের রূপকার,
বিবর্তনের পথে পথে অচল, বন্ধ্যা সমাজ ভেঙে করি নতুন সৃষ্টি,
তবুও চির দাসত্ব থেকে আজও আসেনি আমাদের মুক্তি।

আজ মালিকের সর্বগ্রাসী ক্ষুধার শিকার
আমরা – দুনিয়ার যত মেহনতি মানুষ,
আমাদের শ্রমেই মালিকের গোলা ভরে,
তবুও সবকিছু থেকে বঞ্চিত আমরাই।

সময় হয়েছে বন্ধু, এসো, আজ মিলি একসাথে,
পৃথিবীকে আবার নতুন করে সাজাই,
কোটি কোটি কন্ঠে আওয়াজ উঠুক,
আকাশ বাতাস মূখরিত হোক,
আমরা বাঁচতে চাই,
শোষণহীন শ্রেণিহীন
সাম্যের সমাজ গড়তে চাই।

ঘোর অমানিশা এখন,
যত আছো কাছে-দূরের আপনজন,
হৃদয়ের বাঁধনে বেঁধে
একসাথে এগিয়ে চলবো নিরন্তর,
ভয় নেই বন্ধু, জোনাকি জ্বেলেছে আলো,
পেয়েছি খুঁজে সত্যের পথ।
পথ দুঃসহ, দুর্গম, বন্ধুর হলেও
একদিন আমরাই পৃথিবীকে উপহার দেব
স্নিগ্ধ শীতল ঝলমলে এক নতুন ভোর।

তৈরি হও, ছুটে আসবে ওপার থেকে
জলকামানের গোলা, মারণ বুলেট,
রক্তগঙ্গা যদি বহে এপারে,
তবুও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
রক্তাক্ত দুটো হাত উঁচিয়ে
চিৎকার করে বলব —
পৃথিবীর যা কিছু সৃষ্টি, যা কিছু মহান,
সবেতেই আছে কেবল আমাদেরই অবদান, তোমরা শুধুই গায়ের জোরে
মালিক হয়ে বসেছো।
মৃত্যুর সমন পাঠিয়েছো, পরোয়া করিনা তাতে, দুনিয়া কাঁপানো নতুন এক যুদ্ধ আজ অনিবার্য, এ যুদ্ধ তোমাদের মতো
বাজার দখলের যুদ্ধ নয়,
এ যুদ্ধ শান্তি প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ — এক মহা সংগ্রাম, জানি, সংগ্রামই জীবন,
মৃত্যু তো জীবনেরই এক অধ্যায়,
তারপর আবার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, আজ না হয় মৃত্যুর সাথেই আলিঙ্গন হোক, উত্তাল জোয়ারের মতোই
তোমাদের লৌহপ্রাচীর ভেঙে
আমরা আমাদের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবোই,
আমরা যে দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ
মহা বিপ্লবের সৈনিক।
………………………………………………………