ক্ষুধাতুর বুকে আর্তনাদ

ছোটগল্প
ক্ষুধাতুর বুকে আর্তনাদ – হরবিলাস সরকার

কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা, ভাঙনের সমন আসে বারবার। আর চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে বিঘার পর বিঘা জমি, বাড়ি-ঘর, বিদ্যালয়, কত কিছু! এতেও ক্ষান্ত নেই। অশান্ত ‘গঙ্গা’র এ যেন এক উন্মত্ত প্রতিশোধ-স্পৃহা। তাঁর পশ্চিম পার থেকে সামান্য দূরেই ‘ভূতনি’ গ্রাম। বাংলায় শারদোৎসবের আর মাত্র ক’টা দিন। ভাঙনের সমন আবারও এসেছে। রুষ্ট সমুদ্রও মেঘ হয়ে এসে আকাশ ছাইল ভূতনি আর তার চারপাশের দিগন্তজুড়ে। যন্ত্রণার অশ্রু ঝরাতে লাগল অঝোরে। সে অশ্রজল ‘গঙ্গা’ বইতে পারলনা। দু’কুল ভাসিয়ে দিল।

গ্রামটা চার দিন ধরে জলের তলায়। কাঁচা বাড়িগুলোর বেশিরভাগই জলের তোড়ে ভেসে গেছে। যেগুলো ক্ষত-বিক্ষত, জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, হায়! সেগুলোর টিকে থাকার লড়াই কখন বুঝি শেষ হয়ে যাবে, জানিনা ।

অসহায় মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে উঁচু কোনো জায়গায়, উঁচু পাঁকা বাড়ির ছাদে, আর মাইল দেড়েক দূরে উচ্চ বিদ্যালয়ে। শুধু মানুষই নয়, সেখানে আশ্রয় নিয়েছে গবাদি পশুরা, বিষাক্ত পোকামাকড়। দিনরাত কারও চোখে ঘুম নেই। শুধু বেঁচে থাকার প্রাণপণ লড়াই। তারই মাঝে চলছে মৃত্যুর প্রহর গোনা, আর মৃত্যুকে ‘নিয়তির লিখন’ বলে বরণ করে নেওয়া। চারদিকে শুধুই জল আর জল। গঙ্গার পার বলে আর কিছু নেই, যেন উত্তাল মহাসমুদ্র। মানুষের চোখের জলে তাঁর জলস্তর আরও বাড়ছে ক্রমশ।

জীবনের সংজ্ঞা এখানে এলে বোঝা যাবে ছোট অদ্রিজাকে দেখে। ক্লাস ফোর-এ পড়ে। ওর দাদাকে সাপে কেটেছে। তাকে কাঁধে নিয়ে বাবা হাসপাতালে ছুটে গিয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে মা-ও গেছে পিছে পিছে। ছোট্ট বোনটা খিদেয় পেট চেপে ধরে কাঁদছে। একটু খাবার জল নেই। ঠাকুরদা ঢক ঢক করে বন্যার জল খেয়ে নিচ্ছে।

বাড়ি ছাড়ার সময় বাবা মাছ ধরার ডোঙাটা সাথে এনেছিল। অদ্রিজা বোনের সামনে কাঁদতে পারছিল না। নিজের যন্ত্রণা বুকে চাপা দিয়ে বোনকে সান্ত্বনা দিল। দাদুকে বলল, ওকে দেখ। তারপর ডোঙা ছোটালো অথৈ সাগর-বুকে। শুনেছে – গঙ্গার ওপারে খাবার দেওয়া হবে। অগণিত ডোঙা, ডিঙি, নৌকার পেছন পেছন সে-ও বৈঠা বেয়ে এগোতে থাকল।

না, অদ্রিজার আজ আর মৃত্যুভয় নেই। এখন যে তার ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই। কখন একটা চিঁড়ের প্যাকেট আর গুড় নিয়ে বাড়ি ফিরবে, তারপর হাসিমুখে বলবে – নে বোন, খেয়ে নে। খুব কষ্ট পেয়েছিস, তাই না? দাদু খেয়ে নাও। কিন্তু দাদা? নিমেষে দাদার জন্য দুশ্চিন্তায় কাতর হয়ে উঠল সে। নীরবে কাঁদতে কাঁদতে মনে মনে প্রার্থনা করল, ঠাকুর, আমার দাদাকে বাঁচিয়ে দাও।

সামনে একটু দূরে নৌকা বাইতে বাইতে কে যেন মনের দুঃখে করুন সুরে গান ধরেছে, “বিস্তীর্ণ দুপারে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন?…..?” অদ্রিজার মনে পড়ে – স্কুলে হেড স্যারের মুখে এই গঙ্গা নদীর সম্বন্ধে সে কত কথাই না শুনেছে! গঙ্গা এদেশের প্রধান ও পবিত্র নদী। কিন্তু সে আজ পবিত্রতা হারিয়েছে, তাঁর জল দূষিত, তাঁর বুকে পলি, নুড়ি-পাথর জমেছে, তাই সে আর জল বইতে পারে না। দু’কুল ভাসিয়ে দেয়। মানুষের দুর্দশা হয়।…..। স্যারকে প্রশ্ন করেছিল, এই পলি, নুড়ি-পাথর কি সরিয়ে ফেলা যায় না? স্যার বলেছিলেন, যায়, নদী-পারও উঁচু করে বাঁধানো যায়। এর বেশি কিছু আর বলেননি।

গানের শেষ কলিটা অদ্রিজাকে কেমন যেন ভাবিয়ে তুলল। সে মনে মনে বলল, আহা! গঙ্গার আবার দোষ কী? সে কি তাঁর বুকে জমা পলি, নুড়ি-পাথর নিজে নিজে সরাতে পারে? পারে না বলেই তো বাড়তি জল ধরে রাখতে পারে না। দোষ তবে কার? এর উত্তর অদ্রিজা জানে না। সে-ও ভাগ্যের দোষ দেয়। ভাগ্যের পরিহাসের কথা এতদিন সে বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমার মুখে শুনে এসেছে। শুনতে শুনতে বিশ্বাসও জন্মেছে। ঠাকুমার কথা মনে পড়তেই ভেতরটা শূন্যতায় ভরে উঠল। গত বছরও বেঁচে ছিল। এমনই দিনে বন্যার জলে ডুবে গেছিল, আর ওঠেনি।

চোখের কোণে জল আসে অদ্রিজার। তবু সে মনোবল হারায় না। বৈঠা জোরে জোরে টানতে থাকে। ভাবতেও থাকে, আচ্ছা, ঈশ্বর মানুষকে এত দুঃখ দেন কন? মানুষ তাঁকে এত ডাকে, তবু তিনি শোনেন না কেন? স্কুলে হেড স্যার একদিন বলেছিলেন, ঈশ্বর বলে কিছু নেই, মানুষের কল্পনা। ইস! কেন যে একথা মাথায় চলে এল? মা যে আমাকে বলেছিল, এমন অলক্ষণে কথা বলতে নেই। অভিশাপ নেমে আসে। কিন্তু হেড স্যারের উপর যদি অভিশাপ নেমে আসে? বন্যার জল শুকিয়ে গেলে স্কুলে যাবো। স্যারকে বোঝাবো। উঁনি নিশ্চয়ই ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবেন।

এতক্ষণে সামনের মানুষগুলো প্রায় পৌছে গেছে ওপারে। পরে যারা রওনা হয়েছিল, তারাও জোরে এগিয়ে আসছে, কে কার আগে পৌঁছাবে, কে কার আগে খাবার হাতে তুলে নেবে। দুর্ভাগাদের মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। অদ্রিজাও দুর্বল হাতের পেশীতে জোর দিতে থাকে।

ওদিকে আগে যারা পৌঁছে গেছে, তাদের মধ্যে ছুঁড়ে দেওয়া খাবারের প্যাকেট লুফে নিতে শুরু হয়ে গেছে তীব্র লড়াই। এখন আর ধৈর্য নেই। বিবেক, মনুষ্যত্ব, মানবিকতার বালাই নেই। এখন যে শুধুই আপন আপন পেটের খিদে নিবৃত্তির লড়াই। মনুষ্যেতর প্রাণীদের আচরণ আর মানুষের এই আদিমতার মধ্যে হয়তো আর কোনো প্রভেদ নেই। নাইবা থাকল, তাতে কিবা আসে যায়? জ্ঞানী-গুণী, বিবেকবান মানুষেরা আজ নাহয় প্রশ্ন করুক, সমাজের উঁচুতলায় আলোর কত বাহারি রোশনাই, উন্নয়নের বিপুল জোয়ার, তবে নিচুতলায় এত অন্ধকার, হাহাকার কেন?

থাক্, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শোনার এখন অবকাশ নেই। আপাতত চোখ ফেরাই হতভাগ্য ক্ষধাতুর মানুষগুলোর দিকে।

অদ্রিজা আর তার পেছনের সবাই কিনারে এসে পৌঁছালো যখন, তখন অবশিষ্ট একটা প্যাকেটও নেই। মেয়েটার মুখখানা কালো হয়ে গেল। কী নিয়ে ফিরবে বোন আর দাদুর জন্য?

খবর সংগ্রহ করতে আসা সাংবাদিক এক বন্ধুর হৃদয়টা কেঁদে উঠল। এগিয়ে এল সে। অদ্রিজা শূন্য হাতে ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ আকাশের মুখখানাও ভারী কালো হয়ে এল। তাঁর চোখের ধারা বইতে লাগল প্রবল বেগে। অসহিষ্ণু বাতাসও প্রলয়ের নিশান উড়িয়ে ধেয়ে এল। পেছন থেকে সাংবাদিক উচ্চস্বরে ডাক দিল, দাঁড়াও মেয়ে। অদ্রিজা নৌকার গতি থামিয়ে বৈঠাটা তুলে পেছন ঘুরে তাকায়। এবার প্রশ্ন – নাম কী তোমার? অদ্রিজা। কী যে মনে হল — কিছুটা পিছিয়ে এল সে। সাংবাদিকও কিছুটা এগিয়ে গেল। জানতে চাইল, তুমি প্যাকেট পেলে না কেন? নেই, ফুরিয়ে গেছে। বলতেই কচি চোখের জল দরদর বেগে বেরিয়ে এল। এ দৃশ্য সাংবাদিক বন্ধুকেও চোখের জলে কাঁদিয়ে দিল। জীবনে সে অনেক দুঃখের খবর সংগ্রহ করেছে, কিন্তু এমন করে কাতর হয়নি। তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসছিল। পাশের নৌকায় তিন বানভাসির হাতে তিনটে প্যাকেট ছিল। আড়ষ্ট গলায় চেঁচিয়ে বলল, ভাই, একটা প্যাকেট দেওয়া যাবে? একটু আগের মরে যাওয়া হৃদয়গুলো যেন এক লহমায় পুনরায় জেগে উঠল। একজন হাত বাড়িয়ে একটি প্যাকেট দিতে যাচ্ছিল অদ্রিজার হাতে। অদ্রিজাও দুঃখের অশ্রু মুছে এক ঝলক মিষ্টি হেসে হাত বাড়িয়ে দিল প্যাকেটটা নিতে। কিন্তু হায়! আচমকা দমকা হাওয়ায় তার ডোঙাটা চোখের সামনেই নিমেষে উল্টে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজি চলল। তারপর শুধুই হাহুতাশ। অল্প সাঁতার জানা মেয়েটা জীবনের লড়াইয়ে হেরে গেল। তাকে উদরে পুরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল রাক্ষুসি গঙ্গা।

……………………………………………………….

Leave a Comment