| প্রবন্ধ | বেদনা, প্রতিবাদের বহ্নিশিখা ও মুক্তির সন্ধান |
| শরৎ-সাহিত্যে নারী | – হরবিলাস সরকার |
ভূমিকাঃ
…………..
বাঙালি সমাজজীবনের গভীরতম ক্ষত, নীরব রোদন এবং প্রান্তিক মানুষের অবহেলিত অস্তিত্বকে যিনি সাহিত্যের আঙিনায় সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছিলেন, তিনি সকলের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক, তৎকালীন পরাধীন ও রুগ্ন সমাজকাঠামোর বিরুদ্ধে এক আপসহীন কন্ঠস্বর, দরদী কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নিজের সৃষ্টিশীলতার মূল উৎস সম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছিলেন —-
“সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল উৎপীড়িত, মানুষ হয়েও মানুষে যাদের চোখের জলের কখনও হিসাব নিলে না, নিরূপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোনদিন ভেবেই পেলে না সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই — এদের কাছেও কি ঋণ আমার কম? এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।”
শরৎ সাহিত্যের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে নারী। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের সূচনালগ্নে বঙ্গীয় সমাজ ব্যবস্থায় নারী ছিল কুসংস্কার, পুরুষতান্ত্রিক শোষণ, অবহেলা এবং সীমাহীন যন্ত্রণার শিকার। শরৎচন্দ্র সেই নির্যাতিত, লাঞ্ছিত নারীদের চোখের জলকে শুধু সাহিত্যে রূপ দেননি, বরং তাদের আত্মমর্যাদা ও অধিকারের দাবিকে সমাজের দরবারে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষে এসে সেকথা গর্বের সাথে স্মরণ করছি। আজ স্বাধীনতার আট দশক পরেও যখন সমাজের নারী নির্যাতন, বধুহত্যা, সতীত্ব লুণ্ঠন এবং গার্হস্থ্য হিংসার করাল ছায়া বিস্তৃত, তখন শরৎচন্দ্রের নারী-ভাবনা এবং তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্রগুলি আধুনিক প্রজন্মের কাছে এক নতুন আলো ও লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা।
শরৎ-সাহিত্যে নারীর রূপঃ বেদনার ইতিহাস ও সমাজ-বাস্তবতা
…………………………………………………………..
শরৎচন্দ্র তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পে বঙ্গীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীকে অসীম মমতায় এঁকেছেন। তাঁর লেখনীতেও ফুটে উঠেছে কুলীন প্রথার বলি হওয়া বিধবা, পতিতা, গৃহবধূ এবং সমাজ পরিত্যাক্তা নারী। সমাজ যাদের ‘পাপী’ বা ‘কলঙ্কিনী’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে, শরৎচন্দ্র তাদের ভেতরকার মাতৃত্ব, স্নেহ এবং ত্যাগকে উন্মোচিত করেছেন।
* নিপীড়িতা ও সহনশীল নারী *
‘পল্লীসমাজ’- এর রমা কিংবা ‘দেবদাস’- এর পার্বতীর মধ্যে শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন সমাজশাস্ত্র কীভাবে নারীর ব্যক্তিগত প্রেম ও ইচ্ছাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে। সমাজ ও সংস্কারের চাপে রমা নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে নীরব যন্ত্রণা সহ্য করেছে।
* পতিতা ও সমাজচ্যুত নারীর মর্যাদা *
‘চরিত্রহীন’- এর সাবিত্রী কিংবা ‘শ্রীকান্ত’ – এর রাজলক্ষ্মী ও কমললতার মাধ্যমে শরৎচন্দ্র প্রমাণ করেছেন যে, সামাজিক পরিচয় বা কলঙ্ক দিয়ে নারীর হৃদয় ও আত্মার পবিত্রতাকে মাপা যায় না। বাহ্যিক কলঙ্কের ভেতরও তাদের অন্তর ছিল শুভ্র, পবিত্র ও ত্যাগী।
* মাতৃত্ব ও বাৎসল্য *
‘মেজদিদি’ গল্পের হেমাঙ্গিনী চরিত্রটিতে দেখা যায় পরোপকারী, দৃঢ় এবং বাৎসল্যময়ী এক নারীকে, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অনাথ কেষ্টকে আগলে রেখেছেন। সামাজিক কঠোরতার মুখে দাঁড়িয়ে হেমাঙ্গিনীর এই মানবিক অবস্থান প্রমাণ করে নারী-স্নেহের শক্তির কাছে পুরুষতান্ত্রিক অহংকার কতটা তুচ্ছ!
ব্যতিক্রমী প্রথাবিরোধী ও আধুনিক নারী চরিত্রঃ
………………………………………………………….
শরৎচন্দ্র কেবল নারীদের নিভৃতে অশ্রুবর্ষণ বা নীরব সহ্য শক্তিকে তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি, সময় যত এগিয়েছে, তাঁর সাহিত্যে নারী চরিত্রগুলি তত বেশি স্বাবলম্বী, প্রতিবাদী ও প্রথাবিরোধী হয়ে উঠেছে। পুরুষশাসিত সমাজের অন্ধ সংস্কারকে তারা যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করেছে।
* ‘শেষপ্রশ্ন’- এর কমল *
শরৎ সাহিত্যের সবচেয়ে বিতর্কিত ও প্রগতিশীল চরিত্র হলো ‘শেষপ্রশ্ন’ উপন্যাসের কমল। কমল প্রচলিত বিবাহপ্রথা, অন্ধ সতীত্বের ধারণা এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের উপর সরাসরি তীব্র আপত্তি জানায়। সে নিজের শর্তে বাঁচতে ভালোবাসে এবং অতীতকে নয়, বর্তমানকে প্রাধান্য দেয়। নারী যে কারও সম্পত্তি নয়, তার নিজেরও একটি স্বতন্ত্র সত্তা আছে — কমল চরিত্রটির মাধ্যমে শরৎচন্দ্র এই আধুনিক সত্যকে উন্মোচিত করেছিলেন।
* ‘পথের দাবী’- এর ভারতী ও সুমিত্রা *
‘পথের দাবী’ উপন্যাসে ভারতী ও সুমিত্রা কেবল প্রেমিকা নয়, তারা দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে সক্রিয় অংশীদার। ভারতী অহিংসা, প্রেম ও প্রজ্ঞার প্রতীক, অন্যদিকে সুমিত্রা বৈপ্লবিক চেতনার প্রমূর্ত রূপ। তারা প্রমাণ করেছেন যে, দেশের ও সমাজের মুক্তির সংগ্রামে নারী ও পুরুষের ভূমিকা সমান।
* ‘শেষ প্রশ্ন’- এর বেলা এবং ‘বড়দিদি’- এর মাধবী *
‘শেষ প্রশ্ন’- এর বেলা কিংবা ‘বড়দিদি’- এর মাধবী চরিত্রগুলি অঙ্কনে শরৎচন্দ্র উচ্চ সংস্কৃতির পরশ ও মর্যাদাবোধ ফুটিয়ে তুলেছেন। বাহ্যিক কড়াকড়ি, পাশাপাশি পারিবারিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই চরিত্রগুলোর ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও চিন্তার স্বাধীনতা ফুটে উঠেছে।
শরতের নারী-ভাবনায় শিক্ষার আলো ও আত্মমর্যাদা
…………………………………………………….
শরৎচন্দ্র গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষার অভাব এবং অর্থনৈতিক পরাধীনতাই নারীর এই চরম দুর্গতির মূল কারণ। নারীকে ঘরের কোণে বন্দি রেখে, তাকে কেবল ভোগের বা সেবার সামগ্রী করে রাখলে সমাজ কখনও এগোতে পারে না। শরৎ-সাহিত্যের প্রগতিশীল নারী চরিত্রগুলি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং আত্মমর্যাদার সাথে আপোষ করেনি।
নারীর স্বাধীনতা মানে কেবল পুরুষকে অনুকরণ করা নয়, বরং নারীত্বকে অক্ষুন্ন রেখে নিজের মত প্রকাশের অধিকার অর্জন করা — শরৎচন্দ্র তাঁর গল্পের পরতে পরতে এই বার্তা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নারী যখন জাগে, তখন সে সমাজের সমস্ত অনিয়ম ও অন্যায়কে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে।
বর্তমান সমাজ প্রেক্ষাপটঃ শরৎ-সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা
………………………………………………………
আজ আমরা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে। ভারত আজ স্বাধীন। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির যুগে আমরা এগিয়ে চলেছি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৮০ বছর পার করেও সমাজে নারীর প্রকৃত মুক্তি আসেনি । আজও প্রতিদিন চোখে পড়ে শিশু ও নারী নির্যাতন, সতীত্ব লুণ্ঠন, যৌতুকপ্রথা, সাইবার অপরাধ ও গার্হস্থ্য হিংসার অমানবিক দৃশ্য।
আজও বহু পরিবারে নারী ভোগের বস্তু, বোঝা। এই হীন মানসিকতা ও অমানিশার অন্ধকারে শরৎচন্দ্রের সাহিত্য আমাদের চেতনাকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার পথ দেখায়, আমাদের শিক্ষা দেয় — নির্যাতনের বিরুদ্ধে চুপ থাকা অপরাধ।
সংগ্রামের দীর্ঘ ঐতিহ্যঃ সাবিত্রী বাই থেকে প্রীতিলতা
……………………………………………………….
সমাজকে পরিবর্তনের জন্য কেবল সাহিত্যের আলোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বাস্তব লড়াইয়ের। বাংলা ও ভারতের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই সমাজ থমকে গেছে, তখনই বহ্নিশিখা হয়ে জ্বলে উঠেছেন বীরাঙ্গনারা।
শরৎচন্দ্রের চিন্তাধারার মতোই বাস্তব জীবনে সামাজিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছেন অগণিত মনীষী ও বিপ্লবী।
* শিক্ষা ও সামাজিক অধিকারের লড়াইয়ে *
সাবিত্রীবাই ফুলে ও বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। কুসংস্কার ও অবরোধপ্রথা ভেঙে তারা নারীদের আলোর মুখ দেখিয়েছিলেন।
* সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে *
বিপ্লবী সুনীতি চৌধুরী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত এবং মাতঙ্গিনী হাজরা জীবন বাজি রেখে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
* ঐক্যের ও মুক্তির আদর্শ *
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সূর্য সেন, আসফাকুল্লা খাঁ, বিনয়-বাদল-দীনেশ এবং ক্ষুদিরামের মতো সংগ্রামীদের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।
আজকের নারীদেরও এই ঐতিহ্যের অংশ হতে হবে। প্রকৃত শিক্ষার আলোকে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে সমাজ থেকে অপসংস্কৃতি, হিংসা ও বৈষম্য দূর করতে হবে।
উপসংহারঃ শোষণহীন ও শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন
…………………………………………………………
শরৎ-সাহিত্যের মূল সুর ছিল মানবিকতা। তাঁর চোখে নারীরা কেবল করুণার পাত্রী ছিল না, তিনি তাদের দিয়েছেন মানুষের মর্যাদা।
* মূল শিক্ষা *
নারীকে উপেক্ষা করে কোনো সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। শৃঙ্খলিত নারী সমাজকে কখনও মুক্ত করতে পারে না।
আজ বিশ্বজুড়ে সংকটকালে দাঁড়িয়ে শরৎচন্দ্রের ১৫০ তম জন্মবর্ষ অতিক্রম করার লগ্নে আমাদের অঙ্গীকার হোক — শরতের সাহিত্যের শিক্ষাকে পাথেয় করে, প্রীতিলতা ও বেগম রোকেয়ার মত মনীষীদের আদর্শকে বুকে ধারণ করে ঘরে ঘরে নারীরা জেগে উঠুক বহ্নিশিখা হয়ে। অন্ধকার মুছে নতুন ভোরের আলো ফুটে উঠুক।
আমাদের অঙ্গীকার হোক এক নতুন সমাজ গড়ার — যেখানে কোনো নারী নির্যাতিত হবে না, কোনো মানুষ তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। সেই সমাজ হবে শ্রেণিহীন ও শোষণহীন, যেখানে বিরাজ করবে অনাবিল শান্তি ও মুক্তির আনন্দধারা।
……………………………………………………….